সংবাদপত্রে ২৯ বছরের নির্ভীক যাত্রা: হাসান উল আজিজের কলমে মানুষের গল্প, প্রতিবাদ আর দায়বদ্ধতার ইতিহাস

doinikjamalpurbarta

এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশের সংবাদজগতে নিরলস পরিশ্রম, সাহসী অবস্থান এবং মানবিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল নাম হাসান উল আজিজ।

সাংবাদিকতার দীর্ঘ ২৯ বছরের কর্মময় পথচলা পূর্ণ করেছেন তিনি। এই উপলক্ষে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে তিনি ফিরে দেখেছেন সংগ্রাম, সাফল্য, দায়িত্ববোধ ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে ভরা তার সাংবাদিকতা জীবনের নানা অধ্যায়।

১৯৯৭ সালের শুরুতে দৈনিক ভোরের ডাক পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় যাত্রা শুরু করেন হাসান উল আজিজ। এরপর একে একে কাজ করেছেন দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক সমকাল, আলোকিত বাংলাদেশ, শীর্ষ নিউজ, ডেইলি সান এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশন আরটিভিতে।

বিশেষ করে আরটিভিতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দীর্ঘ ১৯ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমার দেশ ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান-এ কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি নিজেকে পরিচয় দেন একজন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার হিসেবেও।

নিজের পোস্টে তিনি লিখেছেন, সময় কত দ্রুত চলে যায়—দিন, রাত, মাস, বছর পেরিয়ে দেখতে দেখতে সাংবাদিকতায় ২৯ বছর পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বহুবার মনে হয়েছে, হয়তো আর এই পেশায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

নানা প্রতিকূলতা, চাপ, টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে তিনি সাংবাদিকতা ছাড়ার কথাও ভেবেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি। কারণ, এই পেশা তার কাছে শুধু জীবিকা নয়; এটি ছিল মানুষের কথা বলার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে থাকার এক অনন্য দায়িত্ব।

হাসান উল আজিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখা ছিল তার কাছে প্রতিনিয়ত এক নতুন যুদ্ধের মতো। বহুবার মনে হয়েছে—“আর হবে না, আমি হয়তো এ পেশায় আর টিকতে পারবো না।

”কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি দাবি করেন, কোনো অন্যায়, অবৈধতা কিংবা আপসকামিতার সঙ্গে তিনি কখনও নিজেকে জড়াননি।

আর এই আপসহীন অবস্থানের কারণেই গত ১৭ বছরে একাধিক মামলা ও হামলার শিকার হতে হয়েছে তাকে। তবুও সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি মাথা নত করেননি—এবং ভবিষ্যতেও করবেন না বলেই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

তবে তার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পদ-পদবি বা পরিচিতি নয়; বরং অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ।

তিনি জানান, সবসময় চেষ্টা করেছেন সমাজের দুঃখী, অসহায়, অবহেলিত মানুষের কথা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে। আর সেই প্রতিবেদনগুলোর সূত্র ধরে বহু মানুষ সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেয়েছেন—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি কয়েকটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা একটি প্রতিবেদন তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। কালীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস অর্থাভাবে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন।

হাসান উল আজিজের সেই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার নজরে এলে মুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুসের হাতে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়। সেই মুহূর্ত আজও তার হৃদয়ে গর্ব আর তৃপ্তির স্মৃতি হয়ে আছে।

এছাড়া আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের এক অসহায় বৃদ্ধাকে নিয়ে করা আরেকটি মানবিক প্রতিবেদনও তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।

সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ ওই বৃদ্ধার সহায়তায় এগিয়ে আসেন। একইভাবে আদিতমারী উপজেলার ৯০ বছর বয়সী জহিরন বেওয়াকে নিয়ে করা একটি মানবিক প্রতিবেদনও ব্যাপক সাড়া ফেলে।

দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা তার পাশে দাঁড়ান, তাকে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক সহায়তার ব্যবস্থাও করেন। এমন সহস্রাধিক মানবিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে অসংখ্য অসহায় মানুষ সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেয়েছেন—এটিকেই তিনি নিজের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন।

হাসান উল আজিজের ২৯ বছরের সাংবাদিকতা জীবন শুধু একটি পেশাগত পথচলার গল্প নয়; এটি দায়িত্ববোধ, সাহস, মানবিকতা এবং আপসহীন সততার এক জীবন্ত দলিল।

তার লেখনী ও প্রতিবেদন প্রমাণ করে—সাংবাদিকতা কেবল খবর পরিবেশন নয়, এটি সমাজ বদলেরও শক্তিশালী হাতিয়ার। যারা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক, তাদের জন্যও তার এই দীর্ঘ পথচলা হতে পারে অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ।

দীর্ঘ এই পথচলার শেষে এসে হাসান উল আজিজ বলেন, তিনি যেন সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতায় কখনও অবহেলা না করেন। জীবনের বাকি সময়টুকুও যেন সততা, নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে পারেন—সেজন্য তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

সত্য, সাহস আর মানবিকতার মিশেলে গড়া এই ২৯ বছরের যাত্রা নিঃসন্দেহে শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সমাজের অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার এক অনন্য ইতিহাস।

SHARES

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

আরো পোস্টঃ