নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ৭ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দুলাল হোসাইনের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ ১০ মাস ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শেষে ২০২২ সালের এই দিনে তিনি সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৫৭ বছর।
জামালপুরের গণমাধ্যম অঙ্গনের এই গুণী সাংবাদিক শুধু একজন সংবাদকর্মীই ছিলেন না, ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যুতে শূন্যতা আজও অপূরণীয়।
শৈশব ও সংগ্রামী জীবন ১৯৬৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জামালপুর পৌর এলাকার হাটচন্দ্রা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ইদ্রিস আলী ও মাতা আনোয়ারা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী দুলাল হোসাইন আর্থিক অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন।
তবে জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা তাকে দমাতে পারেনি। সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন।
সাংবাদিকতায় বর্ণাঢ্য পথচলা পাক্ষিক জামালপুর প্রবাহ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দুলাল হোসাইনের। এরপর ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের স্মৃতি পত্রিকায় কাজ করেন।১৯৮৮ সালে জাতীয় দৈনিক ভোরের ডাক-এ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন।
পরে পর্যায়ক্রমে দৈনিক সকালের খবর (১৯৯১), দৈনিক সংবাদ (১৯৯৭) এবং সর্বশেষ ২০০০ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজ-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে জেলার সর্বাধিক জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ঝিনাই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অবদান ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর বেসরকারি টেলিভিশন বৈশাখীতে জামালপুর প্রতিনিধি হিসেবে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তার যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর দেশ টিভি এবং ২০১১ সালের ১৮ মে থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন-এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সাংবাদিক নেতা হিসেবে অনন্য ভূমিকা
দুলাল হোসাইন শুধু সাংবাদিকতাই করেননি, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও ছিলেন আপসহীন।১৯৯১ সালে জামালপুর প্রেসক্লাবের ক্রীড়া ও সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে একাধিক মেয়াদে কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০২ সালে প্রথমবার এবং ২০১৮ সালে পুনরায় জামালপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। এছাড়া জামালপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জামালপুর প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ছিলেন।
অসুস্থতা ও শেষ বিদায় মরহুমের বড় ছেলে সাংবাদিক সাইমুম সাব্বির শোভন জানান, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে দুলাল হোসাইনের ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। তিনি কিডনি জটিলতা ও ডায়াবেটিসেও ভুগছিলেন।সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভারতের চিকিৎসক শ্রাবণ কুমার চিন্নিকাটির তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন তার চিকিৎসা চলে।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতের মুম্বাইয়ের সুসরাত হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসক সুরেশ আদভানীর অধীনে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
দেশে ফিরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ভোরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। অবশেষে ৭ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
চিরস্মরণীয় এক নাম মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, দুই ছেলে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার লেখনী, নির্ভীকতা ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা আজও জামালপুরবাসীর হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
সাংবাদিক দুলাল হোসাইন ছিলেন সত্যের পথে অবিচল এক আলোকবর্তিকা। তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর গভীর বেদনায় তাকে স্মরণ করছে সহকর্মী ও এলাকাবাসী।।





