জামালপুরের ঐতিহ্য

জামালপুর জেলার বিভিন্ন জিনিসের দেশজোড়া খ্যাতি রয়েছে। তার মধ্যে ইসলামপুরের কাঁসার বাসন ও গুড়, মেলান্দহের উন্নতমানের তামাক ও তৈল, দেওয়ানগঞ্জের আখ ও চিনি, সরিষাবাড়ীর পাট ও সার, মাদারগঞ্জের মাছ, দুধ ও ঘি, বকশীগঞ্জের নকশীকাথা, চিনা মাটি, নুড়ি পাথর, বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্র এবং জামালপুর সদর উপজেলার আনারস, পান, বুড়িমার মিষ্ট ও আজমেরীর জিলাপী অন্যতম। তাছাড়া জামালপুরের বিভিন্ন এলাকার কংকরযুক্ত লাল বালি, সাদা মাটি, কাঁচবালি এবং শাক-সবজি নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অনেক জেলার চাহিদা মিটাতে সহায়তা করে। জামালপুর নকশি কাঁথা ও নকশি চাদর এখনো সারা দেশে সমাদৃত।
কাসা শিল্পঃ
জামালপুর জেলার ইসলামপুরের কাসা শিল্প একসময় সারা বিশ্বব্যাপি পরিচিত ছিল। কাসা দিয়ে বিভিন্ন নিত্য ব্যবহায্য দ্রব্যাদি তৈরী হত। এর মধ্যে ঘটি-বাটি, পে­ট, জগ, গ্লাস, বদনা, হুক্কা, খেলনা সামগ্রী এবং পূজা পার্বনে ব্যবহুত জিসিষপত্র ইত্যাদি। এগুলোর নির্মাণ শৈলী খুবই চমৎকার ছিল এবং মানুষ এগুলোকে তৈজসপত্র হিসেবে পারিবারিক ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করত। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এ শিল্পের সাথে বেশী জড়িত ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ শিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই দেশ ত্যাগ প্রতিবেশী ভারতে চলে যায়। পাকহানাদার বাহিনী এ শিল্পের সাথে জড়িতদের ঘরবাড়ী আগুনে পুড়ে দেয়ায় স্বাধীনতার পর অকেই দেশে ফিরে তাদের পৈত্রিক পেশা বাদ দিয়ে বর্তমানে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। তাছাড়া আধুনিক যুগে নৈত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদির ধরন বদলে যাওয়ায় বর্তমানে এ শিল্পে ধস নেমেছে। তবুও পৈত্রিক পেশাকে ধরে রখার জন্য বর্তমানে ইসলামপুরে প্রায় ২০/২৫টি পরিবার কাজ করছে। কাসা শিল্পের সাথে জড়িতরা খুবই গরীব। এদেরকে সরকারীভাবে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করা হলে এবং বেসরকারী সংস্থাগুলো এদের পৃষ্টপোষকতায় এগিয়ে এলে এ শিল্পটি তার হৃতগৌরব পুনুরায় ফিরে পেত এবং শিল্পীরা তাদের বাপদাদার পেশাটিকে দীর্ঘদিন বাচিয়ে রাখতে সক্ষম হত।
নকশীকাঁথা শিল্প:
আবহমানকাল থেকেই বাংলার বধূরা স্বভাবগতভাবেই বাংলার ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের দৃশ্যগুলোকে মনের মাধুরী মিশিয়ে সূই-সূতার মাধ্যমে কাপড়ের উপর তৈরী করত অপূর্ব চিত্র। গ্রামের বৌ-ঝিরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে সৌখিনতাবশত, নকশীকাঁথা তৈরী করত। মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে মা, নানী-দাদীরা মেয়েকে শুশুরবাড়ী পাঠানোর সময় বাহারী রঙ এর নকশীকাঁথা সঙ্গে দিত। যারা গরীব তারাও মেয়েকে ২/১টি কাথাঁ বালিশ দিতে ভুলত না। জামালপুরের নকশী কাঁথা ও হাতের কাজের বাহারী পোষাক পরিচ্ছদ সারাদেশে বহু পূর্ব থেকেই প্রশংসিত ছিল। বর্তমানে তা আরো উন্নত হয়ে দেশে ও দেশের বাইরে সমাধৃত হচ্ছে। জামালপুরের বকশীগ্ঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ এবং সদর উপজেলাতেই নকশী কাঁথা শিল্পের কম বেশী উৎপাদন হয়। তবে জামালপুর সদর উপজেলায় এ শিল্পের বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে জামালপুর শহরে এর আধিক্য সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যনীয়। এখানকার পোষাক পরিচ্ছদের গুনগতমান উন্নত হওয়ায় এবং দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশ ও দেশের বাইরে এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ ঐতিহ্যবাহী মনোমুগ্ধকর সূচি শিল্পটি একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিল। ৭০ দশকের শেষভাগে এ শিল্পের চিহ্ন প্রায় বিলুপ্ত হতে থাকে। অবশেয়ে ৮০ দশকের শুরুতেই আবার হারাতে বসা নকশী শিল্পটি পুনরুদ্ধার করে বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গতিযোগ করে ব্র্যাক নামীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি।
নকশীকাঁথা শিল্পের জিনিষ পত্রাদির মধ্যে রয়েছে নকশীকাঁথা, বেড কভার, থ্রীপিছ, ওয়ালমেট, কুশন কভার, শাড়ী, পাঞ্জাবী, টি শার্ট, ফতুয়া, স্কার্ট, লেডিজ পাঞ্জাবী, ইয়ক, পার্স, বালিশের কভার, টিভি কভার, শাড়ীর পাইর, ওড়না, ফ্লোর কুশন, মাথার ব্যান্ড, মানি ব্যাগ, কলমদানী, মোবাইল ব্যাগ, ওয়ালমেট, ছিকা, শাল চাদর ইত্যাদি। নকশীকাঁথা পণ্যের মূল্য ২৫ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মৃৎ শিল্পঃ
কুমার সম্প্রদায় এ অঞ্চলে গ্রামীণ লোকায়ত জীবনে পোড়া মাটির শিল্প দ্রব্য এবং তৈজসপত্র তৈরী করে ব্যাপকভাবে পরিচিতি অর্জন করেছে। ১৯০১ সালের লোক গগণা হিসেবে জামালপুরের কুমার পরিবারের লোক সংখ্যা ছিল ১৫০০ জন। এরা হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। এদের তৈরী জিনিসপত্র জামালপুরসহ সারা দেশেই সমাদৃত ছিল। সে আমলে ভাত তরকারীসহ রান্না-বান্নার যাবতীয় কাজ মাটির হাড়ীতেই হত। মাটির কলসে পানি রাখত, মাটির গ্লাসে পানি এবং কাদাতে (থাল) ভাত খেত। বর্তমানে আধুনিক এল্যুমিনিয়াম, ষ্টিল এবং মেলামাইনের তৈজসপত্র তৈরীর ফলে মাটির বাসন কোসন প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। তবে এখনও কিছু কিছু পরিবারে মাটির বাসন কোসনের ব্যবহার করতে দেখা যায়। মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িতদের অনেকেই পৈত্রিক পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় কাজ করতে উৎসাহী নয়। ফলে তাদেরকে মানবেতন জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এবং এ পেশার সাথে জড়িতদের কথা বিবেচনা করে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া প্রয়োজন।
তাঁত শিল্পঃ
জামালপুরের তাঁত শিল্প এক সময় খুবই উন্নত ছিল। বর্তমানে এ শিল্পটি মৃতপ্রায়। জেলার সদর উপজেলার দিকপাইত, মেষ্টা ও তিতপল্লা ইউনিয়নে বর্তমানে কিছু তাঁতী রয়েছে। বকশীগঞ্জ উপলোয় একটি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ শিল্পটিকে সরকারীভাবে পৃষ্টকতা প্রদান করা হলে শিল্পটি আবারো তার হ্রত গৌরব ফিরে পেতে পারে।
খাবারঃ
জামালপুর জেলার লোকজন সাধারণত ভাত, মাছ, মাংশ, ডাল ও শাক-সবজি খেতে পছন্দ করে। তবে কারো মৃত্যু উপলক্ষে বা কোন বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ জেলার মানুষ একটি বিশেষ খাবার খেয়ে থাকে। তা হলো মেন্দা বা মিল্লি বা মিলানি বা পিঠালি। দেখতে অনেকটাই হালিমের মতো।যেটি গরু বা খাসি বা মহিষের মাংশের সাথে সামান্য চালের গুড়া ও আলু দিয়ে রান্না করা হয়। তার সাথে সাদা ভাত ও মাশকলাইয়ের ডাল। অনেক জায়গায় খাবার শেষে দৈ ও মিষ্টিও দিয়ে থাকে। সূত্র: উইকিপিডিয়া
Pic Credit: Michael Foley

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *