পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ

সংবাদপত্রে জামালপুর

পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ- প্রথম আলো,  মূল লেখার লিংক:

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে নদীতে লাফিয়ে পড়ে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আজ সোমবার সকাল আটটার দিকে দেওয়ানগঞ্জ বাজারের পূর্ব পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে লাশটি উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, যুবককে নির্যাতন করেছিল পুলিশ, এমনকি পানিতে লাফিয়ে পড়ার পরও তাঁকে আঘাত করা হয়।

তবে পুলিশ নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশ ওই যুবককে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ উল্লেখ করে জানায়, বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ওই যুবকের ইজিবাইক থামানো হয়। পরে ভয়ে ওই যুবক পালাতে গিয়ে মারা যান।

যুবকের মৃত্যুর প্রতিবাদে শতাধিক লোকজন থানার সামনে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মারা যাওয়া যুবকের নাম মো. আপেল মিয়া (২৬)। তিনি দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের ডালবাড়ী এলাকার লিয়াকত আলীর ছেলে। তিনি ইজিবাইকচালক ছিলেন। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলেসন্তান রয়েছে। তাঁর স্ত্রী নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

আপেল মিয়ার পরিবারের অভিযোগ, প্রথমে পুলিশ নির্যাতন করেছে। পুলিশের ধাওয়ায় প্রাণে বাঁচতে নদীতে নেমেও রক্ষা পাননি তিনি। পানিতেও লাঠি দিয়ে খোঁচানো হয়েছে। এতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত যুবকের পরিবার, স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল রোববার সন্ধ্যার দিকে থানার সামনের সড়কে পুলিশ মো. আপেল মিয়ার ইজিবাইকের গতিরোধ করে। তাঁকে ইজিবাইক থেকে নামানো হয়। এ সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে থানার সামনে একটি বটগাছের নিচে নিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন তাঁর মাথায় পানি ঢালে। জ্ঞান ফেরার পর তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশও তাঁর পেছনে ছুটতে থাকে। পেছন থেকে ‘চোর চোর’ বলে তাঁকে ধাওয়া দেওয়া হচ্ছিল। পরে দেওয়ানগঞ্জ বাজারের পূর্ব পাশে ব্রহ্মপুত্র নদে তিনি লাফিয়ে পড়েন। এরপর থেকে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। রাতেই স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে খোঁজাখুঁজি করেও পায়নি। আজ সকালে একটি ডুবুরি দল নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

আপেল মিয়ার স্ত্রী সোহাগী বেগম বলেন, কিস্তিতে ইজিবাইকটি কেনা হয়েছিল। গত এক বছর ধরে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাতেন তাঁর স্বামী। তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানান।

সোহাগী বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী যাত্রী নিয়ে থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে প্রথমে মারধর করে। জ্ঞান হারালে পুলিশই আবার তাঁর মাথায় পানি ঢালে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ মারধর না করলে আমার স্বামীর মাথায় আঘাত, পিটে কিলঘুষি ও গলায় আঘাতের চিহ্ন থাকত না। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই।’

দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. শাহনেওয়াজ শাহান শাহ বলেন, ইজিবাইক আটকানোর সময় কিছু না হলে তো এমনি এমনি জ্ঞান হারাননি আপেল মিয়া। ওই সময় নিশ্চয় কিছু হয়েছিল। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরে কোনো কাপড় ছিল না।

দেওয়ানগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চলছিল। থানার সামনের মোড়ে একটি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, এই পথে একটি মাদকের চালান যাবে। তল্লাশির জন্য ওই ইজিবাইক থামানো হয়। ইজিবাইকটি তল্লাশির একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘চোর’ ভেবে ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে তিনি একটি বাড়িতে ঢুকে পড়েন। ওই বাড়ির লোকজনও ‘চোর’ ভেবে ধাওয়া দিলে তিনি নদীতে নেমে যান। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। আজ সকালে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে ওসি বলেন, ওই যুবক একজন মাদক ব্যবসায়ী। যাঁরা মাদক বিক্রি ও সেবন করে, তাঁরাই এসব কথাবার্তা বলছেন। পুলিশ কেন তাঁকে নির্যাতন করতে যাবে। আঘাতের চিহ্ন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাথমিক সুরতহালে যুবকের মরদেহের কান ও নাকে রক্ত এবং গলায় নখের আঁচড়ের দাগ ছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পর সবকিছু পরিষ্কার হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + 12 =