ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায় যে কোনো দিন

বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের রায় যে কোনো দিন ঘোষণা করা হবে।

বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের অভিভাবক।

তাই শুধু বিচার বিভাগ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনাও আমাদেরই করতে হয়। সাত সদস্যের বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োজিত ৯ সিনিয়র আইনজীবী। শুনানিতে আদালতকে আইনি সহায়তা করতে সুপ্রিমকোর্টের ১২ জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১০ জন তাদের মতামত উপস্থাপন করেছেন। একজন সংশোধনী বাতিলের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। বাকি দু’জন মতামত দেননি।

এদিন রিট আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী ও অ্যামিকাস কিউরিদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে জবাব দেয়ার জন্য শুনানির শুরুতে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। তিনি বলেন, কথা ছিল ষোড়শ সংশোধনী আসার সঙ্গে একটা আইন প্রবর্তন করা হবে এবং সেই আইনে নির্ধারিত হবে কিভাবে বিচারপতিদের অসদাচরণ বা অক্ষমতার ব্যাপারে অনুসন্ধান করা হবে এবং এটা নির্ধারণ করা হবে। সে আইনই যেহেতু আসেনি, এমতাবস্থায় এ আইনকে হাইকোর্টের অসাংবিধানিক ঘোষণা করাটাই সঠিক ছিল না। অর্থাৎ এ মামলাই ছিল প্রিম্যাচিউর। আইন আসেইনি, তার আগেই কিভাবে বুঝল পুরো ব্যাপারটাই অসাংবিধানিক?

মুরাদ রেজা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক- এ রিটের পিটিশনারের ওপর দায়িত্ব ছিল তা প্রমাণ করা। সেটা না করে অধিকাংশ অ্যামিকাস কিউরি এবং রিটের পিটিশনার বারবার কোর্টের কাছে দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, পূর্ববর্তী সামরিক সরকার প্রবর্তিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কনসেপ্ট তার চেয়ে বেটার। কিন্তু সেটা মামলার বিচার্য বিষয় নয়। বিচার্য হল ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানবহির্ভূত কিনা?

কারণ ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬ ধারা আমাদের সংবিধানের প্রথম থেকেই ছিল এবং সংবিধানের যে মূল কাঠামো তার সঙ্গেই ছিল। মূল কাঠামো থাকা অবস্থায় সেটা যদি অসাংবিধানিক না হয়, আজ যে মূল সংবিধানের ধারায় ফিরে যাচ্ছি, তাহলে সেটা কিভাবে অসাংবিধানিক হবে? সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ভালো, না আদি ৯৬ ধারা ভালো- তা এ মামলার বিচার্য বিষয় নয়।

তিনি বলেন, মার্শল ল’ অথরিটি বা পরবর্তী সরকার যারা ছিলেন তারা রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের কারণে এ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এনেছিলেন। কারণ, সেখানে রাষ্ট্রপতি ছিলেন চিফ এক্সিকিউটভ। এখন আমরা আবার পার্লামেন্টারি ফরম অব গভর্নমেন্টে ফিরে গেছি। এখন পার্লামেন্টের হাতে সর্বময় ক্ষমতা থাকবে। সর্বময় ক্ষমতা হল জনগণের ক্ষমতা। জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এখানে হাইকোর্টের অসাংবিধানিক ডিক্লেয়ার করাটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় এ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কনসেপ্টটাকে কনডন করা হয়েছিল। কনডন করা হয় সেসব জিনিসকে যা অবৈধ ছিল। সুতরাং যেটা জন্মলগ্ন থেকেই অবৈধ, এখন আর সেটাকে অবৈধতা দেয়ার সুযোগ নেই।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মাননীয় বিচারপতিগণ ওথ বাউন্ড। ভয়-ভীতি, অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থেকে তারা বিচার করবেন- এ বিষয়ে তারা ওথ নিয়েছেন। এখানে যদি কেউ বলেন, এ ষোড়শ সংশোধনী আসার কারণে তারা পার্লামেন্টের প্রতি ভীত হবেন- তাহলে তাদের ওথ ভঙ্গ হবে। তিনি আরও বলেন, এখানে যেসব কথা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অমূলক। এ ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে যে ৯৬ ধারাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে তা জুডিশিয়ারি কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার বিষয় স্পষ্ট করেছে। ষোড়শ সংশোধনী থাকলে জুডিশিয়ারির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। জনগণের কাছে জুডিশিয়ারি কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। একজন অ্যামিকাস কিউরির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, একজন অ্যামিকাস কিউরি বলেছেন, ‘ওই সংসদের হাতে’ কিভাবে আপনারা (বিচারক) বিচার্যের বিষয়টি হস্তান্তর করবেন? কোনো অ্যামিকাস কিউরি কেন, কারও ক্ষমতা নেই পবিত্র সংসদকে অপমান করার। আমি মনে করি এটা সংসদ অবমাননা। এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত অনভিপ্রেত।

এরপর অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত খণ্ডনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, সামরিক শাসনামলে আপিল বিভাগের দুই বিচারপতিকে দেখা গেল, হঠাৎ একদিন আর তারা কর্মরত নেই। এমনকি একজন প্রধান বিচাপতিকে এজলাস থেকে নেমে যেতে হয়েছে মার্শাল ল’ ফরমানের জন্য। পরবর্তী সময়ে আরেকজন বিচারপতিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ দু’জন বিচারপতিকে অতি অসম্মানজনকভাবে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

যে সামরিক ফরমান দ্বারা আমাদের বিচার বিভাগের ওপর এসব অসম্মান কাজগুলো করা হয়েছে, যেই সামরিক ফরমান দ্বারা ৯৬ অনুচ্ছেদকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল- আজকে বিচার বিভাগ সেই সামরিক ফরমানকে যদি মেনে নেয় ও বৈধ বলে ঘোষণা করে, তাহলে সেটা হবে আমাদের জন্য ঐতিহাসিক ভুল। এ মার্শাল ল’ যেসব বিষয় দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, সেগুলো কোনোরকম গোচরে যেন না নেয়া হয়। বরং সার্বভৌম সংসদকে সুযোগ দেয়া তারা যেন ৯৬-এর ৩ ধারা অনুযায়ী আইন করতে পারে। আর সেই আইনে যদি কোনো ব্যত্যয় হয় তাহলে আদালত সেটা দেখতে পারবেন। কিন্তু আমাদের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া অর্থাৎ ৯৬ অনুচ্ছেদে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা যেন তৈরি না হয়।

এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে রিট আইনজীবীদের পক্ষে মতামত উপস্থাপন করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা- এটা বিচারকদের বিষয় নয়। এটা জনগণের বিষয়, এটা সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হলে আইনজীবীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সাধারণ জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অর্থাৎ এ বিচার বিচারকদের জন্য বিচার নয়। এটা জনগণের জন্য বিচার, আইনজীবীদের জন্য বিচার।

৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় আপিল শুনানিতে সহায়তার জন্য ১২ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। তারা হলেন- বিচারপতি টিএইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, এএফএম হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও এমআই ফারুকী, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি, এজে মোহাম্মদ আলী ও ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। এর মধ্যে শেষের দু’জন বক্তব্য উপস্থাপন করেননি। আর ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে মতামত দিয়েছেন। বাকি ৯ জন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন।

বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়।

২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের ওপর ৮ মে শুনানি শুরু হয়। এরপর ৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৮, ২৯, ৩০ মে ও ১ জুন এ মামলার শুনানি হয়।

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three − 3 =