“ওপারে ভালো থাকিস, বন্ধু”

তৌহিদ আহম্মেদ লিখন: মৃত্যুকে কেউ জয় করতে পারে না, যেমন জয় করতে পারেনি মেধাবী শিক্ষার্থী ফুলুও।দারিদ্রতার চরম শিখর থেকে উঠে দাঁড়াতেই হটাৎ-ই তার অকালমৃত্যু!

ফুলুর বয়স আনুমানিক ১৮/২০ বছর হবে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। জামালপুর জেলা, বকশীগঞ্জ থানার কাশমেরচর গ্রামে জন্ম নিয়েছিল ফুলু নামের এই মেধাবী শিক্ষার্থী।ওর বাড়ি থেকে প্রায় ৮/১০ কি:মি: দূরে বকশীগঞ্জ থানায় প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে পড়তে আসতো।বকশীগঞ্জ সরকারি কিয়ামত উল্লাহ কলেজের ছাত্র ছিল ফুলু মিয়া। এইচ এস সি বিজ্ঞান বিভাগ হতে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়।

দারিদ্র যার জন্মসহোদর সে কি করে ভালো সুযোগ সুবিধা পাবে? মেধাবী শিক্ষার্থী হলেও দারিদ্রতার কারণে ফুলু নিজের ইচ্ছে মতো এগিয়ে যেতে পারেনি। তবুও হাল ছাড়েনি,এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে গেছে ফুলু মিয়া। নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে পড়াশোনা করেছে এই মেধাবী শিক্ষার্থী। আমাদের বন্ধু (ফুলুর বাল্যবন্ধু) অন্তর জানায়, ও ছোট থেকেই নানান রোগে ভোগছিল।তাছাড়া ওর জন্মসূত্রে যে প্রধান রোগটি ছিল তা হচ্ছে ‘ডায়াবেটিস’। দারিদ্রতার কারণে তেমন ভালো চিকিৎসা না নিতে পারলেও ডায়াবেটিস কন্ট্রোল রাখতে নিয়মিত সাইকেল চালাতো,পায়ে হেঁটে স্কুলে যেত।কিন্তু তার এই সংগ্রাম হেরে গেছে রোগের কাছে।ওর সাথে আমার যখন ময়মনসিংহ শাখার ucc ভার্সিটি কোচিং-এ দেখা হয় তখনও ও জন্ডিস রোগে আক্রান্ত ছিল। ও ছিল খুব চাপা স্বভাবের।রোগের কাছে নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবতো।হাজার রোগে চাপা পড়েও নিজেকে খুব ভালো রাখার চেষ্টা রাখতো।

দারিদ্র নিয়ে জন্ম নিলেও সহজে কারো কাছে হাত বাড়াতো না। ও যে শুধুই মেধাবী তা কিন্তু নয়- ওর রয়েছে অনেক ভালো চারিত্রিক গুণ; যা সমাজের মুখে, শিক্ষক এবং বন্ধুদের কাছে জানা যায়। আমিও ওর খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ucc কোচিং-এই।এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে আমার বড় ভাই তোফায়েল আহাম্মেদ বাবু’র সাথে থাকতো,অথচ আমি জানতাম না; তা আজ জানতে পারলাম।আমার বড় ভাই জানান, ও দুইদিন ধরে একটু অসুস্থ। হাল্কা ঠান্ডা-জ্বর আর বুকে সামান্য ব্যথা।তিনি(বাবু) ওকে হাসপাতালে যেতে বলেন কিন্তু ও হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে খবর দেয়।এরপর ওর আব্বা ঢাকাতে যায় ওকে বাড়ি আনতে চিকিৎসা করানোর জন্য। ২৪ তারিখ ভোর তিনটার দিকে এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে বাড়ির দিকে রওনা হয়। রেলগাড়িতে বাড়ি ফেরার পথে ও ইন্তেকাল করে।

তারপর ওর লাশ বাড়িতে আনা হয়।ওর যে এভাবে অকালমৃত্যু ঘটবে তা আমরা কেউ জানতাম না।ও যেন ওর রোগগুলোকে যত্নকরে পুষতো। কাউকে বুঝতেই দিতো না ও একজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগী।মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে যে ও আর আমাদের মাঝে নেই।ওর মৃত্যুর খবর শুনে যখন ওর বাড়িতে গিয়ে ওর মৃত নূরানি মুখটা দেখলাম তখন নিজেকে আর সামলাতে পারিনি।সামান্য অবহেলার জন্য ওর আজ অকালমৃত্যু ঘটলো। আমি চাই না বাংলাদেশে এমন মেধাবী শিক্ষার্থী চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করুক।ও শুধু চেয়েছিল নিজের পায়ে দাঁড়াতে কিন্তু ওর নিজের সামান্য গাফিলতির জন্য আজ এই অবস্থা হলো।বন্ধুকে যখন দাফন করে আসলাম তখন যে নিজেকে কি নিঃস্ব মনে হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না! আমি ওর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।আল্লাহ ওকে জান্নাত দান করুক।(আমিন) ওপারে ভালো থাকিস বন্ধু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − nine =