মুভি রিভিউ : অস্কার বিজয়ী সিনেমা  “দ্য শেপ অব ওয়াটার”

দ্য শেপ অব ওয়াটার

নয়ন আসাদ:  দ্য শেপ অব ওয়াটার সিনেমাটি একটি অপার্থিব প্রেমের কাহিনী ।বলা চলে একটি অ্যাডাল্ট উপকথা । ম্যাক্সিকান পরিচালক গিয়ের্মো দেল তোরো’র সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি সিনেমাতে নানান কিসিমের দানব নিয়ে তার অধিকাংশ সিনেমা ।  এই সিনেমাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তার এই সিনেমার দানবটি একটি জলদানব ।আর গল্পটা ষাটের দশকের ।

এলিজা এসপাসিতো একজন বোবা মধ্যবয়সী নারী যে যুক্তরাষ্ট্রের ওকাম মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে । সেখানে একদিন দক্ষিন আমেরিকার একটি নদী থেকে কর্ণেল রিচার্ড স্টিকল্যান্ড মানুষ ও মাছের বৈশিষ্টযুক্ত একটি উভচর প্রাণীকে ধরে নিয়ে আসে যে স্থানীয় উপজাতিদের কাছে দেবতার সম্মান পেয়ে আসছিল । প্রাণীটিকে গবেষণাগারের একটি প্রকোষ্ঠে পানির ট্যাংকে রাখা হয় । জেনারেল ফ্রাঙ্ক হট এই অদ্ভুদ জন্তু সম্পর্কে জানতে এটির উপর পরীক্ষা নিরীক্ষার আদেশ দেন । কিন্তু গবেষণাগারের নতুন আরেকজন বিজ্ঞানী রবার্ট হফসটেটলার যিনি একজন আন্ডারকাভার সোভিয়েত গোয়েন্দা সোভিয়েত গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তিনি নির্দেশিত হন এটিকে কৌশলে হত্যা করার জন্য । কারন সোভিয়েতরা ধারনা করছিল যে আমেরিকানরা হয়তো প্রাণীটিকে পরীক্ষা করে মহাকাশবিদ্যায় অভূতর্পর্ব কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারে ।

এলিজা এসপাসিতোকে সিনেমায় দেখানো হয়েছে নি:সঙ্গ এবং একাকী যার কিনা মাত্র দুজন বন্ধু আছে একজন প্রতিবেশী গিল যে কিনা সমকামী আর অন্যজন তার কৃঞ্চাঙ্গ সহকর্মী জেলদা । পরিচ্ছন্নতা কাজের ফাঁকে এলিজা অদ্ভুদ প্রাণীটির কাছাকাছি আসার সুযোগ পায় এবং তার প্রেমে পড়ে যায় । যখন প্রাণীটিকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয় তখন সে প্রাণীটিকে গবেষনাগার থেকে বের করে আনতে সাহায্য করতে রাজী করায় প্রতিবেশী গিলকে।তার সহকর্মী জেলদাও এতে জড়িত হয়ে পড়ে । এবং এসময় রবার্ট হফসটেটলারও প্রাণীটিকে হত্যা করার বদলে এলিজাকে প্রাণীটিকে বের করে নিয়ে আসতে সহযোগিতা করে । কাপড়েরর ট্রলিতে করে জন্তুটিকে বের করে নিয়ে আসতে সমর্থ হয় এলিজা ও গিলের সহায়তায় প্রাণীটিকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে বাথটাবে লবন যোগ কর তাতে রেখে দেয়  । এরপর এলিজা জলদানবটির সাথে রোমান্সে জাড়িয়ে পড়ে এবং জড়িয়ে পড়ে দৈহিক সম্পর্কে । প্রতিবেশী গিল প্রাণীটিকে  একদিন বাথটাবের  বাইরে আবিষ্কার করে এবং দেখতে পায় প্রাণীটি তার প্রিয় বিড়াল হত্যা করে তার মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে । এসময় প্রাণীটি গিলকে আঁচড় দেয় আর পরদিন গিল আবিষ্কার করে তার মাথায় চুল গজিয়ে যাচ্ছে এবং আঁচড়ের আঘাতও সেরে গেছে ।

ওইদিকে স্টিকল্যান্ড মরিয়া হয়ে জলদানবটিকে খুঁজে আর এলিজা জন্তুটিকে একটি ক্যানেলে ছেড়ে আসার পরিকল্পনা করতে থাকে যেটি গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে । অবশেষে স্টিকল্যান্ড এলিসার ঘরে তল্লাশি করে ক্যালেন্ডার দেখে খুঁজে পায় এলিসা কখন প্রাণীটিকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।

এলিসা আর গিল যখন প্রাণীটিকে নিয়ে ক্যানেলের ধারে  দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানাচেছ তখন স্টিকল্যান্ড যেখানে হাজির হয় আর গিলকে আহত করে এলিসা আর সে প্রাণীটিকে গুলি করে । দুজনই মৃত্যুমুখে পতিত হয় আর এখানেই ঘটে সিনেমার সবচেয়ে বড় টুইস্ট । প্রাণীটি উঠে দাড়ায় আর হাতের পরশে তার আঘাত সারিয়ে তুলে এবং স্টিকল্যান্ডকে হত্যা করে নিহত এলিজা কে নিয়ে ক্যানেলে ঝাপ দেয় । শেষ দৃশ্যে দেখা যায় পানির নিচে প্রাণীটির স্পর্শে শ্বাস নেওয়া শুরু করছে এলিজা । জেলদার বিশ্বাস এলিজা তার পছন্দের প্রাণীটির সাথে সুখেই রয়েছে ।

সিনেমার শেষ এখানেই   পরিচালক দেল তোরো সমকামিতা, মাস্টারবেশন, সেক্স সবগুলোকে সমান্তরালে তুলে এনেছেন অতিশয় সরলতায় । জ্যান্ত বিড়ালের মাথা চিবিয়ে খাওয়া  এবং এমন একটি জলজ জন্তুর সাথে নারীর দৈহিক সম্পর্ক চিন্তা করাটা অনেক সমালোচকই উদ্ভট বলেছেন । অনেকে বলেছেন যখন এলিজা নগ্ন হয়ে প্রাণীটির সাথে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার জন্য এগিয়ে যায় তখন সিনেমাটি তার মুল আবেদন হারিয়ে ফেলে । মানবিক দিকের বাইরে শারিরীক চাহিদার বিষয়টি তখন হয়ে যায় সিনেমার মূল ‍উপপাদ্য যেখানে এলিজা নিয়মিত বাথটাবে মাস্টারবেট করা একজন নারী ।

তবে সিনেমার কাহিনী যাই হোক নির্মান, সেট ডিজাইন এবং ক্যামেরার ব্যবহারে পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক দেল তেরো । সাথে এলিজা চরিত্রে শেলি হ্যাকিন্স এর অনবদ্য অভিনয়ও মন কেড়েছে । সিনেমার মুলকথা ভালোবাসার কোন সীমারেখা থাকেনা সেটা শুধু জাত, পাত নয় বরং সেটা দানব হোক কিংবা মাছ । অস্কার পেয়েছে বলেই সিনেমার বক্তব্যের সাথে একমত হতে হবে এমন দিব্যি কেউ আপনাকে দেয়নি । কিংবা অস্কার পেয়েছে বলেই সিনেমার সৌন্দর্য নিয়েই ভাবতে হবে তেমন কোন বিধিও তৈরি হয়নি।  সিনেমার চরিত্র যদি উভচর মানবসদৃশ মাছ না হয়ে মানুষ হতো তবে দ্য শেপ অব ওয়াটার নিয়ে আলোচনার কোন কারন ছিল না । যদি কুকুর বিড়াল হত তবেও তাহলেও এমন কাহিনী সম্ভব ছিলনা । কিন্তু সে চরিত্র একটা জলজ প্রাণী যে দেখতে মানুষের মত আর এজন্যই এটা কল্পকাহিনী হিসেবে দারুন সিনেমা ।

 

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × five =