বাঁচুন হতাশাবিহীন

হতাশা একটি নিরব ঘাতক, যা আপনাকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে পারে। হতাশায় আক্রান্ত মানুষেরা নিজেরাও জানে না, এটা কতটা ভয়ংকর। হতাশা একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই, আপনি নিজে কিংবা কোন প্রিয়জন এই হতাশায় গহ্বরে তলিয়ে যাবার আগেই সতর্ক হোন এবং চেষ্টা করুন হতাশা থেকে বের হয়ে সুন্দর সাবলীল হতাশাবিহীন জীবন-যাপন করতে।

হতাশা কী?

হতাশা একটি মানসিক অবস্থা। হতাশা সব বয়সের লোককে প্রভাবিত করতে পারে এবং তা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য পৃথক। শিশু, কিশোর বা বৃদ্ধ যে কেউই হতাশায় ভুগতে পারে।

হতাশার লক্ষণগুলো প্রতিটি ব্যক্তির জন্য পৃথক হয়ে থাকে। লক্ষণগুলো এক বা একাধিক হতে পারে। আপনার লক্ষণগুলো আবেগীয়, শারীরিক বা উভয় ভাবেই থাকতে পারে। শিশু, কিশোর এবং প্রবীণদের জন্য হতাশার লক্ষণগুলো আলাদা হতে পারে।

হতাশার লক্ষণ হিসেবে যা দেখা যায়- কেউ নিজেকে দোষী বা অকেজো মনে করছে, অস্থিরতা এবং সহজেই বিরক্ত হচ্ছে, নিজেকে দু:খিত, অসাড় বা নিরাশ মনে করছে, যে কোন ব্যাপারেই আগ্রহ বা আনন্দ হারাচ্ছে, মৃত্যু বা আত্মহত্যার কথা ভাবছে, ক্ষুধার পরিবর্তন (স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাওয়া বা কম খাওয়া), সারাক্ষণ চরম ক্লান্ত লাগছে, খুব বেশি ঘুমানো বা ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে ইত্যাদি।

এই সব লক্ষণগুলো যদি আপনার সাথে মিলে যায়, তাহলে বুঝবেন আপনি হতাশায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার  করণীয় বিষয়গুলো আপনার জন্য তুলে ধরা হলঃ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান

আপনি যদি দীর্ঘ মেয়াদি হতাশায় ভুগে থাকেন তাহলে আপনার উচিত হবে অতি দ্রুত মানসিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া।  মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আপনি হতাশায় ভুগছেন কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। যদি আপনি হতাশায় ভুগে থাকেন, তবে ডাক্তারের পরামর্শ মতো ঔষধ সেবন করতে হবে এবং কাউন্সেলিং করতে হবে।

এক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে বিহেভিয়ার থেরাপি নিতে হবে। বিহেভিয়ার থেরাপি এর মানে হলো আপনি আপনার কাউন্সিলরের কাছে আপনার সমস্যা, দুশ্চিন্তাগুলো তুলে ধরবেন আর তিনি আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার চেষ্টা বাতলে দিবেন। আপনার রোগের উপর নির্ভর করে বিহেভিয়ার থেরাপি অনেক দিন চলতে পারে।

ব্যায়াম করুন

নিয়মিত ব্যায়াম করলে দেখবেন শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকবে।  ব্যায়াম করলে শরীর ও মন সতেজ থাকে, বাড়তি চাপ ও হতাশা থেকে মুক্তি মেলে। নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে “এন্ডোরফিন” নিঃসরণ হয়, যা দুশ্চিন্তা কমাতে ও মন মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাই দুশ্চিন্তা কিংবা মনের প্রফুল্লতা দু’টির জন্যই নিয়মিত ব্যায়াম করা হতে পারে চমৎকার একটি মাধ্যম।

নিয়মিত আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা করে ব্যায়াম করতে পারলে ভাল হয়। সাধারন ভাবে যেসব ব্যায়াম করা যায় তা হলঃ নিয়মিত জগিং করা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি।

পুষ্টিকর খাবার খান

অনেক সময় হতাশায় ভোগা মানুষেরা অনেক কম খান কিংবা অতিরিক্ত খান, যা একবারেই ঠিক নয়। এতে অনেক সময় তাদের বেশি মাত্রায় চাপ ও হতাশা কাজ করে। আর এই সব চাপ ও হতাশা থেকে বাঁচতে প্রোটিন যুক্ত খাবার বেশি করে খান।

প্রোটিন যুক্ত খাবার মানসিক চাপ আর হতাশা থেকে মুক্ত হয়ে মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া থাইরয়েড বা পুষ্টির ঘাটতিগুলোও হতাশার বর্ধমান ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলে, তাই এক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান

যারা হতাশায় ভুগেন তাদের জন্য ঘুম খুব দরকারী। তাদের অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। যারা হতাশায় ভোগে তাদের অনেকেই বেশি ঘুমায় কিংবা কম ঘুমায়। অনেকে আবার সারাদিন বিছানায় পরে থাকে।

আর যদি আপনার এই অভ্যাস থেকে থাকে তবে এই চক্র থেকে বের হতে চেষ্টা করুন। আপনার ঘুমানোর জায়গা যেন অন্ধকার, আরামদায়ক, কোলাহল মুক্ত হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। ঘুমানোর সময় ল্যাপটপ, আইফোন, ট্যাব ইত্যাদি নিয়ে অলস সময় কাটাবেন না।

সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে মানতে চেষ্টা করুন

দুঃখ-সুখের মাঝেই এই জীবন গড়া। সুখ-দুঃখ নিয়েই জীবনের পথচলা। যে কোন সময়ই জীবনের ছন্দ পতন হতে পারে। কেউ পরিক্ষায় ফেল করতে পারে, কারো চাকরি চলে যেতে পারে, কারো প্রিয়জনের মৃত্যু হতে পারে, কারো বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে ইত্যাদি। এসব জীবনেরই অংশ আর এসব নিয়ে বসে থাকলে হবে না।

যতই দুঃখ কষ্ট আপনাকে ঘিরে ধরুক না কেন, তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টাটা অন্তত আপনাকেই করতে হবে। প্রথমে কঠিন মনে হলেও আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারবেন।

বন্ধুদের সাথে সময় কাটান

অনেক সময় দেখা যায় হতাশায় আক্রান্ত ব্যক্তি সবার কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। যেটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত কারণ এর ফলে ব্যক্তির মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, সে নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করে।

এক্ষত্রে উচিত হবে যেসব বন্ধু আপনাকে বুঝে তাদের সাথে মেশা এবং বিশ্বাসী বন্ধুদের সাথে নিজের সমস্যা শেয়ার করা।  সবার কাছ থেকে নিজেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করবেন না এবং সবসময় বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সংস্পর্শে থাকবেন।

বই পড়ুন

বই আমাদের পরম বন্ধু। বই আত্মার খোরাক যোগায়।  হতাশায় ভোগা ব্যক্তির জন্য বই হতে পারে একাকীত্বের সঙ্গী। আপনার যেরকম বই ভাল লাগে কিংবা মোটিভেশনাল টাইপের বইগুলো পড়তে পারেন। বই পরলে মনের ক্ষুধা মেটে, মন ভাল থাকে। তাই, পছন্দের বই নিয়ে পড়তে বসুন এই মুহূর্ত থেকেই।

ডায়েরী লিখুন

আপনি আপনার ভাবনাগুলো ডায়েরীতে লিখুন। দেখবেন এতে মন অনেক হালকা হবে। কাগজে কলমের কালি দিয়ে লেখা অক্ষরগুলো আপনার মনের ভার অনেকটায়ই কমিয়ে দিবে। আপনি আপনার লেখাগুলো আপনার কাউন্সিলরকেও দেখাতে পারেন। তিনি আপনার লেখা পড়ে, আপনার সমস্যার আরও বিস্তৃত ভাবে সমাধান দিতে পারবেন।

সমস্যাকে বড় করে দেখবেন না

সবার জীবনেই সমস্যা থাকে আর তাই সব সময় নিজের সমস্যাকে বড় করে দেখবেন না। দুঃখের পরেই সুখ আসে, তাই ধৈর্য ধরে থাকুন।  মনকে শক্ত করে কঠিন সময় পার হতে চেষ্টা করুন। এছাড়া সমস্যা থাকলে তার সমাধানও নিশ্চয়ই আছে। তাই, সব সময় নিজেকে উত্সাহিত করতে চেষ্টা করুন।

মনোবল হারাবেন না

হতাশার মাঝে থাকলেও মনোবল হারাবেন না। আজ যা হয়নি কাল যে তা হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দিতে পারে। আজকে খারাপ অবস্থায় আছেন বলে কালকে যে সেই রকমই থাকবেন তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে।

প্রবল মনোবল ধরে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে খারাপ অবস্থার সাথে লড়ে, এ থেকে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করুন। আর সব সময় মানসিক ভাবে উৎফুল্ল থাকতে চেষ্টা করুন, দেখবেন সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।

ব্যস্ত থাকুন

কথায় আছে ব্যস্ততায় সুস্থতা, আর তাই সব সময় ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করুন। কাজের মাঝে থাকলে অনেক সময় হতাশা থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকা যায়। মানুষের সাথে মিশলে, কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকলে এমনিতেই মন মেজাজ ভাল থাকবে। আর ব্যস্ত হলে নেতিবাচক চিন্তাগুলোও মনে  দীর্ঘায়িত হবে না।

মানুষের জীবনে যেমন সমস্যা আছে এবং তার সমাধানও আছে। জীবনের কঠিন সময়ে আমাদের হতাশা ঘিরে ধরে। আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যহত করে। তাই, আমাদের প্রত্যেকের উচিত হতাশাকে পাত্তা না দিয়ে, আগামীর পথে হেঁটে যাওয়া। আর তা হলেই দেখবেন যে মেঘময় মলিন হতাশা কেটে, নবদ্বীপ্ত সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে আপনার প্রতিটি দিন!

Source- Sabrina Dilshad Elin, Ullash TV

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *