বৈচিত্রময় জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষা

নয়ন আসাদ:  জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তেমন কোন গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই । তবে জামালপুরের লোকভাষার বৈচিত্র ও সৌন্দর্য মোহিত করার মত। যদিও শিক্ষা বিস্তার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে তবুও পরিশীলিত ভাষার সাথে নিজ জেলার লোকভাষা সম্পর্কে জ্ঞান নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন রাখতে পারে । নিয়ে যেতে পারে শেকড়ে ।

ময়মনসিংহের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ফরিদ আহমদ দুলাল লিখেছেন, জামালপুর অঞ্চলের মানুষ ‘র’-এর উচ্চারণ ‘অ’ করে; যেমন রক্ত-অক্ত, রুটি-উটি, রান্না-আন্না, রাত-আইত ইত্যাদি।

তিনি আরো যোগ করেন, জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের মানুষ শব্দারম্ভে ‘র’-এর উচ্চারণ করে ‘অ’ আবার র-এর সাথে ‘উ’-কার যুক্ত হলে ‘রু’ ‘উ’ হয়ে যায়; যেমন রসুন-অসুন, রাজ্জাক-আজ্জাক, রুইমাছ-উইমাছ ইত্যাদি। অন্যদিকে টাঙ্গাইল অঞ্চলের মানুষ ‘ল’ কে ‘ন’ উচ্চারণ করে। যেমন লাটিমাছ-নাটিমাছ, লাউ-নাই (নাই দিয়া নাটিমাছ দিয়া নেটাপ্যাটা করছাল) ইত্যাদি।

জামালপুরে ব্যবহৃত কিছু বাক্য

ত্যালং ত্যালং (আহ্বলাদ), দিগলা (লম্বা) , ত্যাকত্যাকা (নরম), যেফত (দাওয়াত) ইত্যাদি শদ্বগুলো যে আবহ তৈরি করে তা কি পরিশীলিত ভাষার ব্যবহার করে সম্ভব ?

“বিয়েন বেলাই নহুল না খায়ে গুনার ধরিস নে, মেলা দুরে যায়ানেগব” (সকাল বেলা কিছু না খেয়ে রাস্তা ধরিস নে অনেক দুরের পথ)  , “যাচতে জামাই কাঢুল খায়না পাগারত যাইয়া কতি টানে”( অনুরোধেও জামাই কাঠাল খায়না আবার ফেলে দেওয়ার পর ভাগারে গিয়ে উচ্ছিষ্ট খেয়ে আসে)  ‘দেরী অব কিসক, এদ দন্ডেই বাজারত থনে ঘুরি আসমু’ দেরি হবে কেন এখনই বাজার থেকে ঘুরে আসব )। ইত্যাদি বাক্যগুলোর সাথে সবারই পরিচয় আছে বোধ করি । জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠ রয়েছে যা থেকে এই অঞ্চলের ভাষাকে অন্যান্য এলাকার ভাষা থেকে আলাদা করা যায় । তেমানি কিছু  সংগ্রহীত  বাক্য –

উনু খারাইয়া রইসছ ক্যা? এফায় আবার পাশ না? ( ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আসতে পারিস না?)

আমি তারে ডাহি আর হে দু এইনু বইয়া গপ্প হুনে আর বশ্যিবায়! চাইড্ডা মাছের দায় অত্ক্ষণ দৈরা রৈদঅ বৈয়া আছ্লে! (আমি তাকে ডাকি আর সে এখানে বসে গল্প করে আর মাছ ধরে! সামান্য ক’টি মাছের জন্য এতটা সময় রোদে বসেছিলি!)

আইতের বেলা ইসকাত্ চইরা কুনুকা গেছিলা তুমরা?  (রাতে রিকশায় চড়ে তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?)

সহালে কি করছাল? আমার নগে দেহা করবার পাইছাল না! সহাল-সহাল রনা দিলে অতক্ষণ মীর্জাপুর গেতোগা! (সকালে কী করছিল? আমার সাথে দেখা করতে পারলো না! সকাল-সকাল রওনা হলে এতক্ষণ মীর্জাপুর চলে যেতো!)

গুছুলের সময় ত্যাক্ত করিছ না ! গাডঅ বইয়া খালি কইচ পারিস না, সিদা অইয়া ব আমি ডুব দিয়া উডি! (গোছলের সময় বিরক্ত করিস না! ঘাটে চুপচাপ বসে থাক্ আমি ডুব দিয়ে আসি!)।

 

জামালপুরের কিছু আঞ্চলিক শদ্ব

অক্কাম – অকাজ

গাতা – গর্ত

ঢিলা – আলসে

অগোর – ওদের

গতর – শরীর

ততা – গরম ত্যালং ত্যালং = আহলাদ

ঘশি – শুকনো গোবর

ত্যাকত্যাকা – নরম

আজাইর – অবসর

চলা – লাকড়ি

থালি – থালা

চুককা – টক

ছেমা – ছায়া

ডাংগর – বড়

ডাট – অহংকার

ফটফটা – পরিস্কার

এবেই এডা- এমনিতেই লাঠি (মাছ)- টাহি মাছ
নারকেলের মালা- আর্চি/আইচ্চা/আইচা/ মালাই/আচরি
কাক- কাউয়া/কাইয়া
পাট- পাট/নাইল্যা/নালিতা
ঘুঘু (পাখি)- গুগগু
উকুন- লিক/পুজাইল/পুঞ্জাইল/উহুন/ডেলা
গুনার- রাস্তাওত্তি- ওইখানে

যায়ানছি- যাচ্ছি

খায়ানছি- খাচ্ছি

যামুইতো- যাবইতো

উদিনকে – তরশু

দিয়ে র- দিবনি

খাইয়ে র- খাবনি

সগলাই-সবাই

দুক্কু = আঘাত

আও-কথা

বুগলো = কাছে

কুশের = আখ

ইছা – চিংড়ী

বিয়েনা- সকাল

খেতা – কাথা

তবন= লুঙ্গি

সাগাই- আত্বীয়

ইষ্টি – মেহমান

আইতাছে -আসছে

গেতাছে –  যাচ্ছে

ইনুখে- এখানে

উনুখে- ওইখানে

বেহের- সবার

বাইডেগ- বাহির বাড়ি

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 3 =