ধোপদুরস্ত শহর জামালপুরে ধোপাবাড়ির গাধা কই?

আতা সরকার।।

ছিমছাম পরিপাটি ছোটোখাটো মহকুমা সদর শহর জামালপুর| ষাট বছর আগের শাদাকালো ছবিগুলো ভেসে ভেসে যায়| কিছু মলিন| কিছু অমলিন| কিছু কিছু ছবি ইস্টম্যান কালারে সাজাই| সেসব ছবির অলিগলি ফাঁক-ফোকর গলে ধোপার খোঁজ করি| ধোপাখানার| লন্ড্রির দোকানের| কুয়াশার চাদর যেন সবকিছু ঝাপসা করে রাখে| শহরে কাচারি পাড়ায় কোর্ট কাছারি দেখেছি বটে, কিন্তু তাই বলে আমলাপাড়ায় কোন আমলা, দেওয়ানপাড়ায় কোন দেওয়ানজীকে নজরে পড়েনি| তবে মিয়াপাড়ায় কয়েক ঘর মিয়া রয়েছেন আর গাইড়েল পাড়ায় গরুর গাড়ি গাড়োয়ান দেখেছিলাম|


মাঝিপাড়ায় যেমন অনেক জেলে, মাঝি ও মৎস্যব্যবসায়ী, তেমনি সান্দারপাড়ায় সান্দাররা| পাড়াদুটোর নাম অবশ্য পরে বদলে নেয়া হয়েছে| কিন্তু কোনো ধোপাপাড়া নেই| কোন ধোপাবাড়িও দেখেছি বলে মনে পড়ে না| নানা সুবাদে টমটম, এক্কা গাড়ি দেখেছি ও চড়েছি| ঘোড়া তো দেখাই হয়েছে, তাদের চিঁহিও কানে এসেছে| কিন্তু গাধার ডাক তো শহরে ভেসে আসে নাই! শহরে দেখা হয় নাই গাধার সাথেও| ধোপার গাধা তো নয়ই|


তবে ধোপা ও ধোপীর দেখা মিলেছে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে| পাড় ঘেঁষে সারি সারি পাতা বড় বড় পিড়ি| সেগুলোতে সাবানমাখা কাপড় আছড়াচ্ছে ধোপা ধোপানীরা| সেই ধোয়া কাপড়গুলো খোলা মাঠে দড়ি রশি বা তার টাঙ্গিয়ে রোদে শুকোতে দেয়া হচ্ছে| এ প্রতিদিনকার নিত্য দৃশ্য|
কাপড়গুলো কাদের? আমাদের বাসার কারো কাপড় তো ধোলাইখানায় যেতে দেখিনি| আশপাশ প্রতিবেশীদেরও নয়| এমনকি বন্ধু বান্ধব জানাশোনা কারো বাসাবাড়ি থেকেও নয়| ছোট শহর| সাধারণ মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্তদের আবাসই অধিকাংশ| শহরে ইলেক্ট্রিসিটির বালাই নেই| কিছু বিত্তশালী লোক যে ছিল না তা নয়, কিন্তু এমনও কেউ ছিল না যে এর আগের যুগের ব্যারিস্টার সি আর দাশের মতো যিনি কলকাতায় বাস করে কাপড় ধোলাই ইস্তিরি করিয়ে আনতেন প্যারিস থেকে|


এ কাপড়গুলো অফিস আদালতের| বিশেষ করে পুলিশ আনসারদের| বিভিন্ন দাপ্তরিক ড্রেস| অফিস পাড়ার সাহেব-সুবা-ম্যাডামদের ও তাদের পরিবার-পরিজনদের|
তাই বলে কি জামালপুরবাসীরা ধোপদুরস্ত পরিপাটি ছিল না? ছিল বৈকি| চৌকস স্মার্ট ফ্যাশনিস্ট তরুণের সংখ্যাও কম ছিল না|
আমাদের কাপড় বাসাতেই ধোয়া হয় বাংলা বা বল সাবান দিয়ে| সেখানে প্রয়োজনে এরারুট বা ভাতের মাড়, নীলও লাগানো হয়| সাধারণ পরার কাপড়গুলো ভাঁজ করে বিছানার বা বালিশের তলায় রেখে দেয়া হয়| সেমি ইস্তিরির কাজ ওতেই হয়ে যায়|


ঈদসহ পালা-পার্বন উৎসবসহ অন্যান্য সময়েও তো কাপড়-চোপড় পোষাক-আশাকের ইস্তিরি করা হতো| সে ক্ষেত্রে লোহার ইস্তিরির সাথে জ্বলন্ত কয়লা গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা নিত| ইস্তিরি ছিল দুই ধরনের| একধরনের ইস্তিরি হ্যান্ডেলযুক্ত লোহার পাত| সেটা চুলোর আঁচে গরম করে কাপড় পালিশ করে ইস্তিরি করা হয়| আরেক ধরনের ইস্তিরি লোহার বক্সের আকার| সে বাক্সে জ্বলন্ত কয়লা ভরে তার তাপে কাপড় ইস্তিরি করা হয়|


এর বিকল্পও আছে, যাদের ঘরে এমন ইস্তিরি নেই| কাঁসার থালায় জ্বলন্ত কয়লা রেখে তা কাপড়ের উপর চেপে ইস্তিরির কাজ চলত| তখন পুরু দুটো ন্যাকড়া দিয়ে থালার দুই পাশ ধরা হত| এমন ইস্তিরি পেশাদার লন্ড্রিম্যানের চাইতে কম যায় না|


সে সময় কি শহরে লন্ড্রি ছিল? ঝাপসা স্মৃতিতে ঝটকা দিয়ে যায় বকুলতলার মোড়| এমন দোকান কি ছিল যেখানে জ্বলন্ত কয়লার চুলোর উপর হ্যান্ডেলযুক্ত লোহার পাতের ইস্তিরি গরম করা হতো! পাশেই টেবিলের উপর কাপড় ইস্তিরির ব্যবস্থা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *