লিওনেল মেসির সাক্ষাৎকার

স্প্যানিশ ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকা মার্কা সম্প্রতি ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসির একটি সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে ফুটবলের এই জাদুকর তার পরিবার, পছন্দ, অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ফুটবলের নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। জবান এর সৌজন্যে জামালপুর বার্তার পাঠকদের জন্য  পুরো সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ দেওয়া হলো । 


মার্কা : ১ বছর বয়সী একটি ছেলে তখন বার্সালোনাতে এসেছিল এক বুক উৎসাহ নিয়ে; আজ তার কতটুকু আছে?

লিওনেল মেসি : আমার স্বপ্ন ও আশা একই আছে। তবে হ্যাঁ, এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে, খেলার মাঠের বাইরে কিংবা ভেতরে।

আর আপনার পরিবার? মানে আপনার সঙ্গিনী আন্তোনেলা রকুজ্জো এবং আপনার সন্তানের সাথে সম্পর্ক কিরকম বদলালো?

মেসি : এসবগুলোই একেকটা বড় বড় পরিবর্তন। এক্ষেত্রে হয়ত আপনার দেখার চোখও বদলে যাবে। তবে সত্য হচ্ছে পিতা হওয়ার মতো সুন্দরতম ব্যাপার দুনিয়াতে আর নেই। আমাদের দুটি সন্তান আছে, আরেকটি আসছে। প্রথমবার পিতা হবার যেই অভিজ্ঞতা ছিল, পরেও সেই অবিশ্বাস্য অনুভব বদলায়নি।

সন্তানদের সাথে আপনার সময় কেমন কাটে? থিয়াগোর সাথে আপনার একটি ছবি দেখেছিলাম যেখানে তাকে আপনি গল্প শোনাচ্ছিলেন?

মেসি : আমার দৈনন্দিন সময় কাটেই বাচ্চাদের সাথে। সকালে তাদের স্কুলে আমি নিয়ে যাই, আবার ট্রেইনিং থেকে ফেরার পথে আমি থিয়াগোকে নিয়ে বাসায় আসি। তারপর আমরা বাকি দুই সন্তান আন্তোনেলা এবং ম্যাতেওর সাথে খেলি রাতের খাবারের আগ পর্যন্ত। তারপর তাদের বিছানায় শোয়ায়ে দেই। আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন খুব সাধারণ।

তারা কি বাসায় আপনার সাথে ফুটবল খেলতে চায়?

মেসি : না তারা খেলা নিয়ে তেমন আবদার করে না। ম্যাতেও মাঝেমধ্যে খেলতে চায়। এবং থিয়াগো তো ট্রেইনিং শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তারা আমাকে খেলানোর কোন কথা বলে না।

আপনি যখন বল ছুড়েন, ম্যাতেও কি ডান পায়ে কিক করে না বাম পায়ে?

মেসি : ডান পায়ে, ওরা সবাই ডান পা দিয়েই খেলে।

আপনি বাসায় পৌছেও কি বাচ্চাদের সাথে ফুটবল নিয়ে গল্প করেন নাকি ফুটবলের সব গল্প-চিন্তা দরজার এপাশে ফেলে ঘরে ঢোকেন?

মেসি : আমরা বাসায় ফুটবল নিয়ে কম কথা বলি। হয়তো ক্লাবে বা জাতীয় দলে বড় কোন ঘটনা ঘটবে সেটা নিয়ে অনেক সময় বাসায় আলাপ হয়।

তাহলে তারা আপনাকে কী জিজ্ঞেস করে? তারা কি বোঝে তাদের পিতা লিওনেল মেসি আসলে কতবড় তারকা?

মেসি : ম্যাতেও তো একদম বোঝে না। এমনকি যখন ছবি তোলা এবং অটোগ্রাফের ভীড় লাগে তখন সে হতবিহবল হয়ে যায়। বুঝতে পারে না আসলে কি হচ্ছে। থিয়াগো সব বুঝতে শুরু করছে, সবকিছু অত ভাল বোঝে তেমন না। সে মাঠে যেয়ে খেলা দেখতে ভালবাসে, তবে এখনো পুরো খেলা বুঝতে শেখেনি। সে যখন আমাকে ঘরে দেখে, নিজেও মেসি মেসি করে চিৎকার করতে থাকে।

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? ফুটবল কোচ হবার ইচ্ছে আছে, নাকি অবসর নিয়ে গলফ খেলে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবেন?

মেসি : আমি আসলে এখনো ভাবিনি সামনে কি করবো। হ্যাঁ, পরিবারে আমরা সবাই মিলে নানাসময়ে এই বিষয়ে আলাপ করেছি আমার খেলার ক্যারিয়ার শেষে কি করবো আমি, তবে কিছু ঠিক করতে পারিনি। আমি নিজেকে কোচ হিসেবে ভাবি না, আগেই বলেছি, কোচিংয়ের ব্যাপারটি আসলে আমাকে টানে না। হয়তো আগামী কিছু বছরে আমার ভাবনা বদলেও যেতে পারে, হাতে তো কিছু সময় আছে। দেখি, শেষের দিনগুলোতে একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে।

আপনার একজন সতীর্থ আমাকে বলেছে, আপনি একটু ভারি স্বাস্থ্যের। এতে কি আপনার মনে হয় না, শারীরিক চর্চা আর খাদ্য নিয়ন্ত্রণে আপনার আরো মনযোগী হওয়া উচিৎ?

মেসি : এতে এতো চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আমি সারাবছরই ডায়েটে থাকি। চর্চার পর আমি আবার পায়ে জোর বাড়িয়েছি, কিন্তু আমি নিজেকে জিমের চর্চার সাথে খাপ খাওয়াতে পারি না।

আপনি রান্না করতে পছন্দ করেন?

মেসি : না, আসলে কখনো রান্না করিনি আমি। যদি রান্না করতে পারতাম, সেটাও এভাবে সবাইকে বলে বেড়াতাম না।

খেলার স্বার্থে নিজের প্রিয় খাবারের তালিকা থেকে কোনটি বাদ দিতে হয়েছে সেটা ভক্তদের জানান…

মেসি : হ্যাঁ, সেটি চকলেট। এবং চকলেট খাওয়া বাদ দেওয়া আমার জন্যে বেশ কঠিন ছিল। এখনো আমি সেই কষ্ট অনুভব করতে পারি।

ফুটবল খেলা দেখার সময় পান?

মেসি : হ্যাঁ, এবং আমি সারাক্ষণ ফুটবল খেলাগুলো ফলো করি।

কোন টুর্নামেন্ট বেশি ফলো করেন?

মেসি : মোটামুটি সবই দেখা হয়। বিশেষ করে স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার খেলাগুলোই বেশি দেখি। অবশ্য এসব খেলাগুলোর সাথে আমার যুক্ত থাকা সেটাও দেখার কারণ হতে পারে। তবে এর বাইরেও আমি নানা খেলার খোঁজ রাখার চেষ্টা করি।

লিগ ওয়ানও দেখেন?

মেসি : হ্যা, আগের চেয়ে বেশিই দেখি।

আচ্ছা লিওনেল মেসি হওয়া কি খুব সোজা?

মেসি : আমি তো খুবই সাধারণ মানুষ। যার সাধারণ একটা পরিবার আছে। হ্যাঁ তা ঠিক, আমি আজকের জায়গায় না থাকলে পরিবার নিয়ে আরো সাধারণ জীবন পার করতে পারতাম, যেখানে আমাকে কেউ প্রতিনিয়ত চোখে চোখে রাখতো না।

আপনার এখন চারটি গোল্ডেন বুটএই জয়ের স্মৃতিগুলোকে আপনি কিভাবে স্মরণ করেন?

মেসি : পুরষ্কার আসলে কারো কাজের স্বীকৃত হিসেবে শ্রেষ্ঠ। তবে আমি পূর্বেও বলেছি, পুরস্কারের জন্যে কখনো খেলিনি। আমি বরং চাই, আমার দল আরেকটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অথবা লা লিগা জিতুক। এগুলোই আমার কাছে আগে। কিন্তু এসব পুরস্কার অবশ্যই নিজের থাকা বেশ প্রশান্তির, কারণ এগুলো একান্তই আমার।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আপনারা জার্মানির কাছে হেরেছিলেন। কী মনে করেন, ২০১৮ সালেও জার্মানি ফেভারিট থাকবে, নাকি স্পেন অথবা পর্তুগালের মত অন্য কাউকে এই জায়গায় রাখবেন?

মেসি : জার্মানি সবসময়ের মতো এইবারও ফেভারিট থাকবে। এছাড়া এই তালিকায় থাকবে ব্রাজিল, স্পেন ও ফ্রান্স। তারা এখন সবাই বেশ শক্তিশালী দল, এবং এই বিশ্বকাপে তারা ভাল ফর্মেও থাকছে। প্রতিটি দিন এই ফুটবল খেলা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে।

আপনি ব্রাজিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলেন। অথচ এইবারের কাপে আর্জেন রোবেন এর মত খেলোয়াড়কে দর্শক দেখবে না, অবাক লাগছে কি আপনার?

মেসি : বাছাইয়ের খেলাগুলোও দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে, সেটা দক্ষিণ অ্যামেরিকায় হোক বা ইউরোপে। এখন ফুটবল বেশ চেনা খেলা এবং যেকোন ছোট দেশও ভাল খেলে খেলাকে কঠিন করে দিতে পারে। নেদারল্যান্ড এবারের কাপ থেকে ছিটকে পড়েছে, এমনকি ইতালিও। অথচ এই দলগুলো দশক ধরে খেলছে এবং এভাবে ছিটকে পড়বে সেটি কেউ ভাবেনি।

তুরস্কের অনেক দর্শক আরদা তুরানের সমালোচনা করছে। আপনার এ বিষয়ে অভিমত কী?

মেসি : আরদা নিঃসন্দেহে বড় খেলোয়াড়, অসাধারণ তার খেলা। তবে একটি টিমে খেলার জন্যে যে ধরণের আত্মবিশ্বাস এবং ধারাবাহিকতা দরকার, তা তার নেই। সে এথলেটিকো মাদ্রিদে ছিল, সেখানে তিনি খেলতেনও ভিন্ন পজিশনে। খেলা তো খুব সাধারণ কিছু নয়। ফুটবল বেশ কঠিন খেলা বলেই বুঝি। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন খেলোয়াড় খেলছে এবং তার ধারাবাহিকতা আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ভাল খেলোয়াড়।

ইতালির বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়াকে কিভাবে দেখেন? আপনি কি মনে করন ইতালি ইউরোপের শক্তিশালী দেশ হিসেবে আগের সুখ্যাতি আজ হারাতে বসেছে?

মেসি : এটি সত্য যে, ইতালির আগের দল আজ আর নেই। এটাই বাস্তবতা। তবে এর সাথে বাছাই পর্ব থেকে বাদ পড়ার কোন সম্পর্ক নেই। ক্যালসিও এর দুটি শক্তিশালী দল, এ সি মিলান এবং ইন্টার এখন যেমন আছে, বছর দশেক আগে তেমন ছিল না। এবং পুরো ফুটবল বিশ্বেই এ নিয়ে আলাপ আছে। তবে এদেরকে ইউরোপ পর্যায়ে খেলার জন্যে আরো শক্তিশালী হতে হবে।

‘ব্যালন ডি অর’ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে কি নিজের প্রতিযোগী ভাবেন? কিংবা আপনাদের দুজনের বাইরে অন্য কোন নাম কি ভাবেন?

মেসি : ‘ব্যালন ডি অর’ পাওয়ার মতো অনেক খেলোয়াড়ই এখন ফুটবলে আছে। যেমন নেইমার, মবাপ্পে, সুয়ারেজের মতো খেলোয়াড়েরা এখন এই তালিকায় আসার মতো খেলাই খেলে।

রোনালদো কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে আপনারা দুজন ভাল বন্ধু হতে পারেন। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

মেসি : জানি না আমরা কি ভাল বন্ধু হতে পারবো কিনা। আসলে বন্ধুত্ব তো তৈরি হয় একসাথে সময় কাটালে, নিজেদের বুঝতে পারলে। আমাদের দুজনের মধ্যে তেমন কোন সম্পর্ক নেই, আসলে দুজনের প্রোগ্রাম-পুরস্কার বিতরণের বাইরে তেমন দেখা হয় না। এবং কেবলমাত্র তখনই আমাদের মধ্যে কথা হয়। আমাদের দুজনের সম্পর্ক বেশ স্বাভাবিক, তবে আমাদের পরস্পরের মধ্যে তেমন আসা যাওয়া নেই।

 

সৌজন্যে : জবান

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − 10 =