এবারের যুদ্ধে আসলেই হামাসের দায় কতটুকু ছিল?

মোজাম্মেল হোসাইন ত্বোহা ।।

হামাসের দায় কতটুকু সেটা বুঝতে হলে হামাসের সাথে ইসরায়েলের গত কয়েক বছরের সম্পর্কটা একটু বুঝতে হবে। হামাসের সাথে এ পর্যন্ত ইসরায়েলের দফায় দফায় অনেকগুলো যুদ্ধ হয়েছে। ছোটখাটো সংঘর্ষ তো সব সময়ই ছিল, মেজর যুদ্ধগুলোর মধ্যে ছিল ২০০৫ সল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা, ২০০৮-২০০৯ সালের যুদ্ধ, ২০১২ সালের যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালের যুদ্ধ।
এসব যুদ্ধের কোনোটাই অবশ্য সমানে সমানে যুদ্ধ ছিল না। ইসরায়েলের তুলনায় হামাসের সামরিক শক্তি খুবই কম। সুতরাং প্রতিবারের যুদ্ধেই ইসরায়েলের তুলনায় গাজাবাসীর প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক অনেক গুণ বেশি। শুধু প্রাণের হিসেব করলেই ৩৫ থেকে ৯০ গুণ বেশি।
কিন্তু এর বিনিময়ে হামাসের অর্জন কী? অর্জন একটাই। সেটা হলো তাদেরকে নিজেদের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে হয়নি। তাদেরকে নিজেদের এবং গাজাবাসীর প্রাণ উৎসর্গ করতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তারা নিজেদের মাতৃভূমির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে। গত ২৭ বছরে এক ইঞ্চি মাটিও ইসরায়েল তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি।
এই সময়ের মধ্যে বরং হামাসের হাতে নাজেহাল হয়ে ইসরায়েল বাধ্য হয়েছে গাজা থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিতে। কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করা ৮,০০০ সেটলারকে তাদের বাড়িঘর ফেলে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নিতে।
বিপরীতে ১৯৯৪ সালে শান্তিচুক্তি করার পর থেকে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে যাওয়ার পর থেকে গত ২৭ বছরে ফাতাহ’র অধীনে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের অর্জন কী? একটাই অর্জন, এই সময়ে তারা তুলনামূলকভাবে ইসরায়েলের হাতে কম মারা গেছে। শুধু মৃত্যুসংখ্যা দেখলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা বুঝি খুব সুখে আছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবন গাজাবাসীর চেয়েও করুণ।
কারণ এই সময়ে ইসরায়েল একটু একটু করে পশ্চিম তীরের অর্ধেরও বেশি এলাকা দখল করে নিয়েছে। অবৈধ সেটলারের সংখ্যা সোয়া এক লাখ থেকে বাড়িয়ে পৌনে তিন লাখে উন্নীত করেছে। এবং যেই এলাকাগুলো ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোরও চারপাশ ঘিরে ইসরায়েল এমনভাবে অবৈধ সেটলমেন্ট তৈরি করেছে যে, সেগুলো একেকটা পরিণত হয়েছে বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে।
সেখানে পাশাপাশি অবস্থিত দুই এলাকায় আত্মীয়-স্বজনরা একে অন্যের সাথে দেখা করতে, স্কুলে বা হাসপাতালে যেতে হলেও তাদেরকে পার হতে হয় একাধিক ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট, অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। সেখানকার পানির রিসোর্সগুলো ইসরায়েল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, কৃষকরা কেবল কোনোমতে জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকতে পারে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি হচ্ছে, পশ্চিম তীরের আরব জনসংখ্যা যেন বৃদ্ধি না পায়। এবং সেজন্য জমি দখল, বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদসহ এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করছে না। তাদের এই নীতি উঠে এসেছিল সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী লেভি এশকলের একটা উক্তিতে। ৬৭ সালের যুদ্ধে পশ্চিম তীর দখল করার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যৌতুক হিসেবে বিশাল ভূমি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে আগের ঘরের একটা স্ত্রীও পেয়েছি, যাকে আমরা চাই না।
গত পাঁচ দশক ধরে ইসরায়েল তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে পশ্চিম তীরের এই আগের ঘরের স্ত্রীকে তার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। সোজা কথায় পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি অধিবাসীদেরকে দেশ থেকে উচ্ছেদ করতে এবং ধীরে ধীরে বাকি এলাকাগুলোও দখল করে নিতে। এবং পশ্চিম তীরের এলাকা দখলের কাজে যে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে এবং হচ্ছে, কিন্তু গাজায় যে ব্যর্থ হয়েছে, তার প্রধান কারণ দুই এলাকার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পার্থক্য।
গাজায় হামাস যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বলেই ইসরায়েল প্রাণহানির ভয়ে সেখান থেকে নিজেদেরকে ডিসএনগেজ করে নিয়েছে। আর ওদিকে ফাতাহর নেতারা “শান্তিচুক্তি”র টোপ গিলে, ইসরায়েল এবং আমেরিকার স্বীকৃতি নিয়ে, ইসরায়েলের সমর্থন এবং সহযোগিতা নিয়ে ফিলিস্তিনের ক্ষমতায় বসে টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত আছে আছে বলেই সেই সুযোগে ইসরায়েল একটু একটু করে পশ্চিম তীর দখল করে নিচ্ছে।
তো এটা হচ্ছে হামাসের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড। তারা যুদ্ধ চালিয়ে না গেলে ইসরায়েল কখনোই গাজা ছাড়ত না। সেখানেও সেটলমেন্ট তৈরি করে ফিলিস্তিনিদেরকে উচ্ছেদ করত। কাজেই হামাস হ্যাজ এভরি রাইট টু ফায়ার রকেট অন ইসরায়েল। এখন তারা কখন রকেট ফায়ার করবে, কখন চুপ থাকবে, সেটা হচ্ছে পলিটিক্যাল এবং স্ট্র্যাটেজিক্যাল ডিসিশান।
কিন্তু তারা রকেট ছোঁড়ে বলেই ইসরায়েল আরও বেশি হামলা করার অজুহাত পায় – এটা প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না। হামাসের জন্মের আগে থেকেই ইসরায়েল তাদের দখলদারিত্ব চালিয়ে আসছে, এবং যেখানে হামাস নাই, সেই পশ্চিম তীরেও তারা দখলদারিত্ব ধরে রেখেছে। হামাসের আক্রমণের কারণেই বরং ইসরায়েল গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না।
কিন্তু গাজাকে মুক্ত রাখা তো আর বিনা ত্যাগে সম্ভব হবে না। এবং সেই ত্যাগটাই হচ্ছে হামাসের কমান্ডারদের এবং সাধারণ গাজাবাসীর প্রাণ। আপনার-আমার কাছে হয়তো মনে হতে পারে স্বাধীনতার চেয়ে প্রাণের মূল্য বেশি। হামাসের এবং গাজাবাসীর কাছে যে সেটা মনে হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। স্বাধীনতা, সেটা অবরুদ্ধ স্বাধীনতা হলেও, ধরে রাখার জন্য তারা এই ত্যাগ স্বীকার করাকেই প্রায়োরিটি দেয়। ঘাসসান কানাফানির ভাষায়, ইটস সামথিং দ্যাটস ওয়ার্থ ডাইয়িং ফর।
এটা গেল হামাস কেন ইসরায়েলে আক্রমণ করে, সেই ব্যাখ্যা। এবার আসা যাক এবারের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। এবারের সঙ্কট শুরু হয়েছিল গাজায় না, পশ্চিম তীরে। শেখ জাররাহ এলাকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। (এটা নিয়ে আগেও লিখেছি, সেটা পড়তে পারেন, অথবা ভাইস নিউজরর ডকুমেন্টারিটা দেখতে পারেন।)
কাজেই এবার হামাসের সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধ হওয়ার কথা ছিল না। খোদ ইসরায়েলিরাও সেটা আশা করেনি। কারণ বহু বছর ধরে হামাস পশ্চিম তীরের কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের উপর বড় ধরনের আক্রমণ করেনি। এমনকি ট্রাম্প যখন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে সেখানে দূতাবাস সরিয়ে নিয়েছিল, এবং তার প্রতিবাদে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনের উপর গুলি চালিয়ে একদিনেই ইসরায়েল ৫৭ জনকে হত্যা করেছিল, তখনও হামাস রকেট ছোঁড়েনি।
কিন্তু এবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে হামাস আল্টিমেটাম দিয়ে ইসরায়েলকে আকসা মসজিদ থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বলেছে, এবং সেটা না করায় ইসরায়েলের উপর রকেট হামলা শুরু করে যুদ্ধটাকে গাজার দিকে নিয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তারা এবার এই কাজ করল?
উত্তরটা বেশ ইন্টারেস্টিং। হামাসের সাথে ইসরায়েলের সর্বশেষ বড় যুদ্ধটা হয়েছিল ২০১৪ সালে। ঐ যুদ্ধে সোয়া দুই হাজার ফিলিস্তিনি শহিদ হয়। কিন্তু বিপরীতে হামাসের হাতে নিহত হয় ৬৭ জন ইসরায়েলি সৈন্য। অনুপাতটা অনেক বেশি অসম হলেও ইন্তিফাদার বাইরে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই যুদ্ধে ইসরায়েলিদের নিহতের এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক অনেক বেশি। কাজেই যুদ্ধ শেষে ইসরায়েল বুঝতে পারে, হামাসের সাথে যুদ্ধ তাদের নিজেদের জন্যও খুব একটা লাভজনক না।
যুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলোতে কাতারের মধ্যস্থায় ইসরায়েল হামাসের সাথে এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছে। তারা গাজায় অবরোধ জারি রাখে ঠিকই, কিন্তু সেটা কিছুটা শিথিল করে। কাতারকে তারা অনুমতি দেয় হামাসকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদানের। হাজার হাজার গাজাবাসী ফিলিস্তিনিকে তারা পুনরায় ওয়ার্ক পারমিট প্রদান করে ইসরায়েলের ভেতরে প্রবেশ করে কাজ করে অর্থ উপার্জন করার জন্য। বিনিময়ে হামাস ইসরায়েলের উপর রকেট হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়।
মোটামুটি ২০১৭ সাল থেকেই হামাসের সাথে ইসরায়েলের এই অলিখিত সমঝোতা চলে আসছে। এরমধ্যেও অবশ্য ইসরায়েল তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলে, কাতারের দেওয়া ফান্ডিং হস্তান্তর করতে দেরি করলে, বা শ্রমিকদেরকে কাজ করতে বাধা দিলে হামাস রকেট নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু সেটা বড় কিছু না। সেটা ছিল “রকেট ডিপ্লোম্যাসি”। বড় ধরনের আক্রমণ হামাস তখন থেকে আর করেনি।
এটাই ছিল জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরেও হামাসের চুপ থাকার কারণ। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল ইসরায়েলের সাথে নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়াতে। অবরুদ্ধ গাজাবাসী যে কিছুটা স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল, সেটাতে ব্যাঘাত না ঘটাতে। নিজেদের উপর ইসরায়েলি বিমান হামলা টেনে না আনতে।
এবং এই নীরবতা তারা শুধু পশ্চিম তীর বা জেরুজালেমের জন্য না, গাজার জন্যও পালন করেছিল। ২০১৮ সালে রকেট নিক্ষেপের পরিবর্তে সমগ্র গাজা জুড়ে তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছিল। গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন নামে পরিচিত দীর্ঘ কয়েকমাস ব্যাপী চলা ঐ আন্দোলনে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র গাজাবাসী শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসরায়েলের কাঁটাতারের সীমান্তের কাছে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল সীমান্তের ওপারে দখল হয়ে যাওয়া নিজেদের আদিনিবাসে ফিরে যাওয়ার দাবি জানাতে।
কিন্তু ইসরায়েল তাদের ইতিহাসে কখনোই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা দেখায়নি। এবং এই আন্দোলনেও তারা প্রতিদিন গুলি চালিয়েছে। তাদের আক্রমণে নারী-শিশু এবং স্বাস্থ্যকর্মীসহ ১৮৩ জন নিহত হয়। আহত হয় আরো ৯০০০+।
অবশ্য তিন মাস অপেক্ষা করার পরেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় হামাস রকেট নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এবং এরপরেই কেবল ইসরায়েল লাইনে আসে। আরেকদফা গোপন আলোচনা এবং সমঝোতার পর ইসরায়েল অবরোধ আরেকটু শিথিল করতে সম্মত হয়, এবং বিনিময়ে হামাসও জনগণকে আহ্বান জানায় আন্দোলন স্থগিত করতে।
এই গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন পুনরায় গাজাবাসীকে সেই পুরানো শিক্ষাটাই আবার স্মরণ করিয়ে দেয় – ইসরায়েল শান্তির ভাষা বোঝে না, তারা কেবল যুদ্ধের ভাষাই বোঝে। কাজেই হামাস যে পরবর্তীতে গ্রেট মার্চ অফ রিটার্নের মতো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে না গিয়ে সরাসরি রকেট ডিপ্লোম্যাসিতে ফেরত যাবে, এটা অনেকটা অনুমিতই ছিল। কিন্তু সেটা যে তারা গাজার জন্য না, পশ্চিম তীরের জন্যও করবে, সেটা কেউ আশা করেনি। কারণ পশ্চিম তীর হামাস শাসন করে না। ওটা শাসন করে হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ।
গুরুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের দিক থেকে ট্রাম্পের জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর কিন্তু এবারের শেখ জাররাহ’র ঘটনা, কিংবা তার প্রেক্ষিতে আকসা মসজিদে পুলিশের আক্রমণের ঘটনার তুলনায় কোনো অংশেই কোন ছিল না। কিন্তু তারপরেও সে সময় রকেট হামলা না করে হামাস যে এবার রকেট হামলা করে নিজেদের উপর ইসরায়েলি আক্রমণের, ম্যাসাকারের ঝুঁকি নিয়েছে, এখানেই আসে ফাতাহ-হামাস অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের রাজনীতি।
ফাতাহ-হামাস দ্বন্দ্ব অনেক পুরানো। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনের সংসদ নির্বাচনের পর। ঐ নির্বাচনে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের পছন্দের প্রার্থী ছিল ফাতাহ। আমেরিকা ফাতাহকে ২ মিলিয়ন ডলার দেয় ক্যাম্পেইন চালানোর জন্য। ইসরায়েল কারাবন্দী ফাতাহ প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার টিভিতে প্রচার করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু তারপরেও তাদেরকে হতাশ করে দিয়ে বিপুল ব্যবধানে হামাস জিতে যায়।
এর পরপরই শুরু হয় ষড়যন্ত্র। আমেরিকা এবং ইসরায়েল জনগণের ভোটে বিজয়ী হামাসকে সরকার গঠন করতে দিবে না, কারণ তাদের দৃষ্টিতে হামাস সন্ত্রাসী। তাদের সাহায্য এবং সমর্থন নিয়ে ফাতাহ সরকার গঠন করে। মোহাম্মদ দাহলানের নেতৃত্বে ফাতাহর নিরাপত্তাবাহিনী গঠনের জন্য আবারও আমেরিকা ফান্ডিং করে এবং সিআইএ ট্রেনিং দেয়। এবং সেই বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল হামাসের উপর ক্র্যাকডাউন চালানো।
শেষপর্যন্ত ফাতাহ-হামাসের এই দ্বন্দ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। হামাস ফাতাহকে পরাজিত করে গাাজ থেকে উচ্ছেদ করে। এরপর থেকে ফিলিস্তিনে এক দেশে দুই সরকার। গাজা কেবল হামাসের নিয়ন্ত্রণে, আর পশ্চিম তীর কেবল ফাতাহর নিয়ন্ত্রণে। এবং ওটাই ছিল ফিলিস্তিনের সর্বশেষ নির্বাচন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সংসদীয় বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর এবার ফিলিস্তিনে সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই নির্বাচন বাতিল করে দেওয়ার অজুহাত খুঁজছিল সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, স্বৈরাচার, ফাতাহ প্রধান মাহমুদ আব্বাস। কারণ নির্বাচন হলে তার জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। নাহ, জরিপ অনুযায়ী হামাসেরও এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কাজেই আব্বাসের মূল ভয় হামাস ছিল না, বরং ছিল তার নিজের দলেরই একাধিক জনপ্রিয় নেতা।
দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি আর লুটপাটে মেতে থাকা, আর ফাতাহর অভ্যন্তরেই ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করা আব্বাসের জনপ্রিয়তা ফাতাহর অভ্যন্তরেই তলানিতে। আর সেজন্যই ফাতার এমন কিছু নেতা আব্বাসের অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে পৃথকভাবে কারাবন্দী ফাতাহ নেতা মারোয়ান বারগুথির নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এবং জরিপ অনুযায়ী এই নির্বাচনে এই জোটেরই জয়লাভ করার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ছিল।
হামাস নিজেও এই নির্বাচন নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল। দেড় দশক অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে গাজাবাসীর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এককভাবে জয়লাভ করতে না পারলেও তাদের আশা ছিল, ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে খ্যাত এবং জনপ্রিয় মারোয়ান বারগুথি জয়ী হলে তার দলের সাথে তারা জোট গঠন করে সরকার গঠন করতে পারবে, যা দুর্নীতিবাজ, স্বৈরাচার এবং আমেরিকার পাপেট আব্বাসের সাথে সম্ভব না।
কিন্তু তাদের এই আশায় গুঁড়েবালি দিয়ে সম্প্রতি মাহমুদ আব্বাস নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেয়। এবং সে অজুহাত দেখায়, ইসরায়েল জেরুজালেমে ভোটগ্রহণের অনুমতি দিতে রাজি হচ্ছে না। সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে, নির্বাচন স্থগিতের কাজটা আব্বাস আমেরিকা-ইসরায়েল কিংবা তার আরব ব্যাকারদের পরামর্শেই করেছে।
নির্বাচন স্থগিতের এই ঘোষণাটা মাহমুদ আব্বাস দেয় গত ২৯ এপ্রিল। তখন সবেমাত্র শেখ জাররাহর ঘটনা নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। এবং আব্বাসের সরকার আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিদের উপরেও ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছিল, সমাবেশ করতে তাদেরকে বাধা দিচ্ছিল। কারণ তার ভয় ছিল, আন্দোলন হাতছাড়া হয়ে গেলে সেখান থেকে নির্বাচনের দাবিও উঠতে পারে, তার বিরুদ্ধেও শ্লোগান উঠতে পারে, এবং সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা এবং ইসরায়েলের সাথে তার যে “শান্তি” বজায় রাখার বোঝাপড়া আছে, তা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
ঠিক এই সুযোগটাই এবার গ্রহণ করে হামাস। শেখ জাররাহর ঘটনায় নিশ্চুপ থাকায় এবং আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করায় এমনিতেই ফাতাহর গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আল-আকসা মসজিদে আক্রমণের পরেও ফাতাহকে কোনো ভূমিকা পালন করতে না দেখে ফিলিস্তিনিরা যখন হতাশ এবং ক্ষুব্ধ, তখন তাদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয় হামাস।
তারা ইসরায়েলকে আল্টিমেটাম দেয় আকসা এবং শেখ জাররাহ থেকে সরে যাওয়ার। এবং ইসরায়েল সেই আল্টিমেটাম পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর সত্যি সত্যি তারা ইসরায়েলে রকেট হামলা করে। তারা তাদের এই অপারেশনের নাম দেয় “অপারেশন সোর্ড অফ জেরুজালেম”।
বাস্তবে হামাস খুব ভালো করেই জানত ইসরায়েল তাদের আল্টিমেটাম মেনে শেখ জাররাহ থেকেও সরবে না, আকসা থেকেও সরবে না। উল্টো দীর্ঘদিন যে তারা গাজায় মোটামুটি শান্তিতে বসবাস করছিল, এই রকেট হামলার মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটবে এবং ইসরায়েলের আক্রমণে তাদের বেশ কিছু কমান্ডার এবং যোদ্ধাসহ কয়েকশো সিভিলিয়ান মারা যাবে। কিন্তু তারপরেও বৃহত্তর পলিটিক্যাল স্বার্থে ঐ মুহূর্তে তারা এই ঝুঁকিটা নেওয়াই লাভজনক মনে করেছে।
এই অপারেশনের মাধ্যমে হামাস শুধুমাত্র ইসরায়েলকেই না, একইসাথে নির্বাচন বাতিল করার জন্য মাহমুদ আব্বাসকেও একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছে। আব্বাস, আমেরিকা আর ইসরায়েল যে তথাকথিত শান্তির স্ট্যাটাস কো ধরে রাখতে চেয়েছিল, সেটাতে আঘাত করতে চেয়েছে। এবং এই কাজে তারা অনেকটাই সফল। হামাসের রকেট হামলার পর পশ্চিম তীরে, জেরুজালেমে, আকসা প্রাঙ্গণেও হামাসের পক্ষে শ্লোগান শোনা গেছে। ফাতাহর পরিবর্তে হামাসই ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় মাহমুদ আব্বাস অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।
ফিলিস্তিন সংকটের সহজ কোনো সমাধান নাই। এবং হামাসের এই রিস্কি অ্যাডভেঞ্চারের ফলেও বাস্তবে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আসবে না। ইসরায়েল তার আগ্রাসন থামাবে না। মাহমুদ আব্বাসও রাতারাতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে না। কিন্তু ইসরায়েলের এবং আব্বাসের সকল অন্যায় চুপচাপ মেনে নিলে তারা ভবিষ্যতেও যে একের পর এক এরকম আরও অন্যায় করে যেত, এবারের হামাসের অপারেশনের পর হয়তো হয়তো সেরকম কিছু করতে একটু চিন্তা করবে। হামাসের দৃষ্টিতে হয়তো সেই একটুটাই বেটার দ্যান নাথিং।
টু সামআপ, হামাসের আক্রমণের ফলে প্রতিবার ইসরায়েল লাভবান হয়, ফিলিস্তিনিরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় বলে যে একটা বয়ান প্রচলিত আছে, সেটা খুবই সরলীকৃত অনুসিদ্ধান্ত। বরং হামাস আক্রমণ না করলেই যে ফিলিস্তিনিরা শান্তিতে থাকত, এটা বারবার মিথ্যা হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। এবং বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরায়েলকে ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য মাঝে মাঝে এরকম রকেট নিক্ষেপ ছাড়া হামাসের হাতে তেমন কোনো বিকল্প নাই।
এবং এবারের সংকটের এসক্যালেশনের জন্য অনেকে যে একচেটিয়াভাবে হামাসকে দায়ী করছে, সেটাও খুবই সিমপ্লিস্টিক ভিউ। বরং ঘটনার গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে এবং ঘটনার পেছনের ঘটনা বিবেচনায় নিলে এবারের এসক্যালেশনের জন্য মাহমুদ আব্বাসকেই বেশি দায়ী বলে মনে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *