ভুডু চর্চার ইতিহাস

ভুডু—এই একটা শব্দই যথেষ্ট মানুষের মনে ভয়ের স্রোত তোলার জন্য। কুৎসিত কোনো পুতুলকে শত্রু ভেবে তাতে সূচালো পিন বসানো, মুরগির গলা কেটে রক্ত পান করা, গর্জিত আগুনকে ঘিরে শয়তান পুজারীদের নৃত্য। কিন্তু এর কোনো কিছুই ভুডুর আসল চিত্র তুলে ধরে না। ভুডুর ব্যাপারে আমাদের এই চিন্তাধারনা মূলত এসেছে হরর মুভি বা কোনো জনপ্রিয় ভৌতিক গল্পের বই থেকে। তবে বাস্তবতা হলো এটি একটি ধর্ম, একটি আইনী ধর্ম। যার শেকড় প্রাচীনতম আফ্রিকা থেকে শুরু করে বর্তমানের অন্য দেশেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ভুডুআফ্রিকা থেকে ওয়েস্ট ন্ডিজ

ফ্রান্সের ঔপনিবেশীক সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাইতিতে ভুডুর উৎপত্তি, এবং আজও হাইতিতে এটা চর্চা করা হয়। সতেরো দশকে পশ্চিম আফ্রিকার উপজাতীয় ক্রীতদাসদের মাধ্যমেই এর শুরু। তাদেরকে মূলত দাহোমের রাজ্য থেকে বন্দি করা হতো। ভুডু শব্দটি দাহোমের ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ আত্মা, ঈশ্বর। হাইতিতে দীর্ঘকালিন সময়জুরে ভুডু নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করে।

পশ্চিম আফ্রিকার ভিন্ন ভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠি থেকে হাইতিয়ান ক্রীতদাস বন্দি করা হতো। ধর্ম এবং ধর্মের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে এসব গোত্রের অনেক সাদৃশ্যতা ছিল। যেমন— পূর্বপুরুষের আত্মার পূজা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ড্রামের ব্যবহার ও নাচগান করা এবং পূজারীরা অবিনশ্বর আত্মার অধিকারী এ কথায় বিশ্বাস করা। হাইতিতে থাকাকালীন এসব ক্রীতদাস নিজেদের বিশ্বাসের এবং অন্যের ধর্মের সংস্কৃতি ও ক্ষমতাধর দেবতার ভিত্তিতে একটি নতুন ধর্ম তৈরী করে। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিও তাদের আকৃষ্ট করে নতুন ধর্ম তৈরীতে। অনেক ক্রীতদাস এ ধর্মটি পছন্দ করে ফেলে কারণ এর অধ্যাত্মিক সংস্কৃতি তাদেরকে আকৃষ্ট করে এবং দৈনন্দিন জীবনের কষ্টকে উপেক্ষা করে পূজায় মত্ত হওয়ার মাধ্যমে তারা মানসিকভাবে শান্তি উপভোগ করে। যদিও ধর্মের প্রতি বিশ্বাস তাদেরকে স্বাধীন করতে পারেনি। আফ্রিকারা বরাবরই তাদেরকে কোনঠাসা করে রেখেছিল। ক্রীতদাসের মালিকরা তাদেরকে নিপীড়ণ ও মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে বাধা দেয় এ ধর্ম পালনে এবং তাদেরকে ক্যাথলিক ধর্মের দীক্ষা দেয়। যার ফলে আফ্রিকায় ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তবুও ক্রীতদাসরা লুকিয়ে বা মুখোস পড়ে নাচের আসরের মতো করে ভুডু চর্চা করত। ভুডু চর্চাকারীরা তাদের নতুন ধর্মে ক্যাথলিক সাধুদের যুক্ত হওয়াকে নতুন সমৃদ্ধি হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। যার ফলে ভুডু ধর্মে ক্যাথলিক সংস্কৃতিও যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত-শ্রেণীর হাইতিনরা ভুডু ও ক্যাথলিক ধর্মকে ধীরে ধীরে পরিহার করছে। তবে চাষী-শ্রেণীর হাইতিয়ানরা এখনও ভুডু চর্চা করে।

বর্তমানে নিউ ওরলেন্স, মিয়ামি, চার্লসটন ও নিউ ইয়োর্ক শহরের অনেক শক্তিশালী সম্প্রদায় এ ধর্ম চর্চা করে এবং প্রতি সম্প্রদায়ই এর সাথে যুক্ত করেছে নতুন নতুন সংস্কৃতি। পৃথিবীজুড়ে ভুডু চর্চাকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটির কাছাকাছি।

ফিচার ইমেজ: daybreakgames.com, সূত্র: ullashtv.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 14 =