করোনা ভাইরাস: লক্ষণ, প্রতিকার ও করণীয়

সম্প্রতি বিশ্বে এক আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। চীনের উহান শহর এর উৎপত্তি স্থল। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ উহান শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ খুব লক্ষণীয় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এটি চীন কর্তৃপক্ষের চক্ষুগোচর হলে প্রথমেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে দেয় এর ব্যাপারে। এরপর ১১ জানুয়ারি ২০২০, উহান শহরে প্রথম একজনের মৃত্যু সংঘটিত হয় এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে।

এরপর থেকেই ভাইরাসটি বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে চীনের রাজধানী সহ অন্যান্য শহরগুলোতেও। চীনে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৬১০ জন এবং এদের মধ্যে ৫৪ জন মৃত্যু বরণ করেছে।

এরই মধ্যে ভাইরাসটির প্রকোপ দেখা দিয়েছে বিশ্বের আরো ১৩টি দেশে। কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, নেপাল, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম। এছাড়াও আরও কয়েকটি দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার খবর শোনা গেছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় ঝুঁকির মধ্যে আছি আমরাও। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চীনের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়ে যাচ্ছে ও চীন থেকে বাংলাদেশে আসছে। তাই করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশ সংক্রামিত হওয়ার প্রকট সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্ভাবনার কথা ভেবেই বাংলাদেশের বিমানবন্দরে নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। চীন থেকে আসা বাংলাদেশীদের বিমানবন্দরেই পরীক্ষা করা হচ্ছে । সচেতন করা হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল ও মিডিয়ার মাধ্যমে। আশেপাশের দেশগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

ইতোমধ্যে ভারতে জারি করা হয়েছে হাই-অ্যালার্ট। সাবধান করা হচ্ছে ভাইরাসটি সম্পর্কে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুরু করা হয়েছে থার্মাল স্ক্রিনিং। পাশাপাশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে চূড়ান্ত সতর্কতার। আশংকাজনক দেশ নেপালে এক ব্যক্তির দেহে নিশ্চিত হওয়া গেছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ সতর্কতার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশটি।

করোনা ভাইরাস

এর আগে কখনো করোনা ভাইরাসের এই প্রজাতিটি দেখা যায়নি। তাই এটিকে ২০১৯- এনসিওভি নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। করোনার কয়েক রকমের প্রজাতির মধ্যে সাত ধরনের প্রজাতি মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম।

প্রায় দশ বছর আগে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্স নামে ভাইরাসের সংক্রমণে সারা বিশ্বে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। সেটিও ছিল এক প্রজাতির করোনা ভাইরাস। তখন সার্সে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষ। করোনার আরেকটি প্রজাতি সংক্রামিত হয়েছিল ২০১২ সালে। যার নাম মিডল ইস্টার্ন রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স। তখন এতে বিশ্বজুড়ে মৃত্যু ঘটে ৮৫৮ জন মানুষের।

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা

ভাইরাসটি নতুন হওয়ায় গবেষকরা এখন পর্যন্ত এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারেননি। করোনা ভাইরাস সরাসরি মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে আরেকজনের দেহে শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণ সর্দিজ্বর বা ঠাণ্ডা বা ফ্লুর মতো করে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। এটি মানুষের দেহে প্রবেশের ফলে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে যাকে অরগ্যান ফেইলিওর বলে।

এছাড়া নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে। বর্তমান অবস্থায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। সম্পূর্ণ পাওয়া খবর অনুযায়ী আক্রান্তদের প্রায় দুই শতাংশ মারা গেছেন এবং এই হার দ্রুতই আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এর সাথে সাথে এটির ভয়াবহতা বেড়ে চলেছে।

জন হপকিন্স সেন্টারের সিনিয়র গবেষক ড. এরিক টোনার একটি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সংক্রামিত ভাইরাসটি সার্স ভাইরাসের চেয়ে কিছুটা হলেও নমনীয় প্রজাতির। যা কিনা ভয়াবহতার পথে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস। তবে তিনি এও বলেন, ভাইরাসটির সংক্রামিত হওয়ার আধিক্য সার্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্ততপক্ষে, উৎপত্তি স্থল ও স্থানীয় জনপরিসরে।

বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন, ভাইরাসটি মানুষের দেহকোষের ভেতরে ‘মিউটেট’ করার ক্ষমতা রাখে। এরই মধ্যে হয়তো সেই প্রক্রিয়া শুরুও করে দিয়েছে। ‘মিউটেট’ হচ্ছে ভাইরাসের পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করা এবং এর সংখ্যাবৃদ্ধি করা। যার ফলে খুব দ্রুতই আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে অন্যদের দেহে ছড়িয়ে পড়বে এটি।

ভাইরাসটির বাহক

ধারনা করা হচ্ছে, কোনো প্রাণীই হচ্ছে করোনা ভাইরাসের উৎস। কোনো প্রাণী থেকেই সর্ব প্রথম ভাইরাসটি মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। তারপর আক্রান্ত মানুষ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মাঝে। এর আগেও করোনা প্রজাতির সার্স ভাইরাসটি প্রথমে বাদুড় থেকে এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করার রেকর্ড রয়েছে । আর এর আরেক প্রজাতি মার্স ভাইরাসও ছড়িয়েছিল প্রাণী থেকেই। সেটির বাহক ছিল উট।

করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বাহক হিসেবে ধারণা করছে সামুদ্রিক কোনো প্রাণীকে। এটির সাথে উঠে এসেছে উহান শহরের সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা। এই শহরের উপকূলীয় একটি বাজারে যাওয়া আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম এই রোগের সংক্রমণ দেখা গেছে। যেখানে প্রধান কেনাবেচার জিনিস হলো বন্যপ্রাণী। যা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বেচা ও কেনা হতো। বাজারটিতে সাপ, মুরগি, বাদুড়, খরগোশ ইত্যাদিও বিক্রি হতো।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি সংক্রামিত করোনা ভাইরাসটি বহন করতে পারে।

সংক্রামিত হওয়ার লক্ষণ

করোনা ভাইরাসের কয়েকটি প্রধান লক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান লক্ষণ হলো নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর আসা এবং হঠাৎ করে হাঁচিও কাশি বেড়ে যাওয়া। বিজ্ঞানীদের মতে, ভাইরাসটি কারো দেহে প্রবেশ করার পর এর সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে প্রায় পাঁচ দিন লেগে যায়। এটির প্রথম লক্ষণ হচ্ছে আক্রান্ত রোগীর গায়ে জ্বর আসা। এরপর পরই রোগীর মধ্যে প্রকাশ ঘটে শুকনো কাশির। সপ্তাহ খানিকের মাঝেই রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

চিকিৎসা বা প্রতিকার

নতুন যেকোনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে চিকিৎসা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়। কেননা সাথে সাথেই এর টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয় না। করোনা ভাইরাসটিও নতুন হওয়াতে এখনও এর কোনো টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত এর কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিও জানা যায়নি। যেটির দ্বারা এই রোগের ভয়াবহতা কমানো যেতে পারে। তবে এটি প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে এটি সম্পর্কে সচেতন করে তোলার তাগিদ দিয়েছে। নিজেদের হাত ভালোভাবে নিয়মিত ধোয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। সাধারণ হাঁচি-কাশির সময়ও নাক-মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। যেকোনো ধরণের ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকতে হবে। চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। হাত দিয়ে নাক মুখ কম স্পর্শ করতে হবে যাতে হাত থেকে সহজেই ভাইরাসটি দেহে প্রবেশ করতে না পারে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা যাবে না। সব ধরণের ময়লা পোশাক সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলতে হবে। বাড়ির আঙিনা ও বাসা পরিষ্কার রাখতে হবে যাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দূরে থাকা যায়। রান্নার ক্ষেত্রে সকল জিনিসপত্র জীবাণু মুক্ত রাখতে হবে। প্রাণীজ খাদ্য যেমন- ডিম, গোশত ভালো করে রান্না করে খেতে হবে।

উল্লেখিত প্রাথমিক লক্ষণ গুলোর মধ্যে এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে মুক্ত রাখতে হলে সকলকে সচেতন হতে হবে।

Tasmia Tabassum, Ullash TV. Feature Image- Al Jazeera

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *