বাহাদুরাবাদ বালাসী ফেরীঘাট: তীরে এসে তরী ডুবছে!

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট বৃটিশ আমলের। ১৯৩৮ সালে বৃটিশ সরকার এই ঘাট টি চালু করেছিল। এক সময় এই ঘাটের নাম ডাক ছিল সারা দেশ এবংকি বিদেশ জুড়ে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিদ্রোহী নেতা, শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাম অনুসারে বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের নাম করন করা হয়। শুরুতে ঘাট বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল আর সেই নাম অনুসারেই বাহাদুরাবাদ ঘাটের নামকরন করা হয়।

উত্তরবঙ্গের ৯ টি জেলার হাজার হাজার লোকজন এই ঘাট দিয়ে পার হয়ে ট্রেনে ঢাকায় যেতেন। দেশের উত্তরবঙ্গের সাথে ময়মনসিংহ অঞ্চলের যোগাযোগের সেতুবন্ধনের এই ঘাট টি যমুনার দুই পারের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ছিল কিন্ত নাব্যতা সংকট এবং যমুনা নদীর গতি প্রকৃতি বারবার বদলে যাওয়া সহ নানা কারণে এবং বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হবার পর ২০০৫ সালে ১৫ জুন এই ফেরিঘাট টি বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই নদী পথে চলাচল করছে। প্রতিকূল পরিবেশে ও আবহাওয়ার কারনে অনেক সময় বহু লোক নৌকা ডুবে প্রাণ হারিয়েছে। ছোট ছোট নোকায় শত শত যাত্রী গহীন খড়স্রোতা যমুনা নদী দিয়ে পার হচ্ছে। দুই পারেই বেশী ভাড়া আদায়ের অভিযোগও আছে। এভাবেই চলছে যমুনার দুই পারের লোক জনের যাতায়াত।

বাহাদুরাবাদ ঘাট এরিয়ার চুকাইবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুজ্জামান সেলিম খান বলেন, ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে তিন ঘন্টায় নৌকায় পারাপার হচ্ছে মানুষ। তারা নিরুপায় হয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে চলছে। ফেরি চালু হলে দুর্দশা লাঘব হত । ২০১৩ সালের ২৯ মার্চ বিআইডব্লিউটিএ এর প্রশাসনিক এক সভায় এ নৌরুটি পুনরায় চালু করে ফেরিঘাট নির্মানের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালের ১২ মার্চ এখানে আসেন নৌ-মন্ত্রী সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ,পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে ফেরি চালুর বিষয়ে ঐক্যমত পোষন করেন। তার আলোকে ডিপিডি প্রস্তুত করা হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে একনেক সভায় এই প্রকল্প অনুমোদন হয়।

প্রথমে ব্যায় ধরা হয়েছিল ১২৪ কোটি ৭৭ লাখ। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প দুইবার সংশোধন করে ব্যয় বাড়ীয়ে ১৪৫ কোটি ২ লাখ টাকা ধরা হয় এবং ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে এসে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কারিগরি টিম গঠন করে বিআইডব্লিটিএ কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এপ্রিল-মে মাসে এসে এই কমিটি সরেজমিনে এই নৌরুটের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে নৌরুটের নাব্যতা সংকট, ২৬ কিলোমিটারের বিশাল দূরত্বের নৌপথ, একবার পার হতে ৪-৫ ঘন্টার সময় লাগা এবং ষ্টেকহোল্ডার এনালাইসিস ও সম্ভাব্যতা সমিক্ষা না করে প্রকল্পের স্থান নিরুপণ করা সহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে এই রুট ফেরি চলাচলের উপযোগী নয় বলে মতামত দিয়েছে। প্রতিবেদনে দুই প্রান্তের ফেরিঘাট অন্যত্র স্থানান্তর সহ নির্মিত স্থাপনা অন্য কাজে লাগানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিআইডব্লিওটিএর কারিগরী কমিটির এই সিদ্ধান্তে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে ।

প্রকল্পের ১৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচ করে বাস টার্মিনাল, টোল আদায় বুথ, পুলিশ ব্যারাক, ফায়ার সার্ভিস , আনসার ব্যারাক সহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করার পরে কারিগরি কমিটির হঠাৎ নেতিবাচক সিদ্ধান্ত প্রদান করায় বিআইডব্লিউটিএ’র কাজের ভূমিকা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকের অভিযোগ আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করে কাজ শুরু করে শেষ পর্যায়ে এসে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট প্রকল্পটি বাতিলের মতামত দেওয়া ঠিক হয়নি।

এ বিষয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট এরিয়ার জামালপুর এক আসনের সংসদ সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, বাহাদুরাবাদ বালাসী ফেরিঘাটটি চালু করার জন্য যা কিছু করা দরকার তাই করব। ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে আছেন, তার সাথে আমার কথা হয়েছে, তিনি দেশে আসলে দুইজন মিলে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোলায়মান হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই ফেরিঘাট চালু হবে এটি এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী ছিল। ফেরিঘাট চালুর স্বপ্নে আশায় বুক বেঁধে ছিল সবাই, এই ঘটনায় আশাহত হয়েছে । নৌরুট চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী করছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রসিদ জানান, ফেরীঘাট চালু হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা আরো সচল হবে। আমি আশা করি আবার কারিগরি কমিটি সমিক্ষা চালিয়ে কিভাবে নৌরুট টি চালু করা যায় সেই ব্যবস্থা নিবেন, আমি সেই প্রত্যাশা করছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *