জামালপুরের রঙময় স্বপ্নদিন: বাল্যকালের সিনেমা হল- আতা সরকার

আতা সরকার

কবে থেকে সিনেমা হলে ছবি দেখা? সিনেমাকে ছবিই বলা হতো। টকিও। আবার কখনো কখনো আলাপচারিতায় বলা হতো, অমুক হলে কি বই চলছে? সিনেমা বইও বটে।ঝাপসা মনে পড়ে। মায়ের কোল ছেড়েছি কিনা ছাড়ি নাই। সেসময় পুরো পরিবার সিনেমা হলে ঢুকেছিলাম। আমি ছিলাম মার সাথেই। নিরব ছবি। হাত মুখ চলাফেরা সবই চলে। তবে কোনো সংলাপ নাই। ব্যাকগ্রাউন্ডে মাঝে মাজে বাজনা, গানও। কি ছবি, কারা অভিনেতা কিছুই মনে নাই। গল্পটাও না। একটা গান কানে তালি দেয়, হাসি হাসি হবে ফাঁসী বিদায় দে মা ঘুরে আসি। ছবিটা কি ক্ষুদিরামের উপর? এরপর মা আর কখনো সিনেমা হলে গিয়েছেন কিনা মনে পড়ে না। তবে সিনেমা দেখার পোকা হয়ে উঠেছিলাম আমি। সেই ছোটকাল থেকে।গল্পটা গত শতকের পঞ্চাশ ষাটের দশকের। শহর জামালপুরের।

বাঁশের চাটাই কেটে তাতে রঙ্গীন পোস্টার সাঁটিয়ে বাঁশেরই দন্ডে বেঁধে বানানো হয় ফেস্টুন। পোস্টার মানে সিনেমার পোস্টার। ঢাক ঢোল নহবত সানাই বাজিয়ে চলে কয়েকজনের শোভাযাত্রা। দু’তিনজনের কাঁধে ফেস্টুন। একজনের হাতে টিনের চোঙ। ওতে মুখ গুজে গলা ফাটিয়ে চলছে ঘোষণা: অমুক হলে চলিতেছে তমুক সিনেমা। তেমন হিট ছবি হলে রিকসায় মাইক লাগিয়ে চলে সিনেমার ঘোষণা। ফাঁকে ফাঁকে বেজে ওঠে সিনেমার গান।ওরা শহরময় টহল দেয়। আর বিলায় হ্যান্ডবিল। নায়ক নায়িকা খলনায়ক স্টার অভিনেতার ফটো। সিনেমা, প্রধান প্রধান অভিনেতা অভিনেত্রী, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালকের নাম। কোন হলে ছবি চলছে তারও কথা। এই হ্যান্ডবিল পাওয়ার জন্য মন আকুলিবিকুলি করতো। শোভাযাত্রার পিছে পিছে ছুটে যেতাম অনেক দূর। একটা হ্যান্ডবিল পাওয়ার আশায়।

শহরে সিনেমা হল দুইটা। এন্তেজার হল। আর নিরালা হল। বুঝ-জ্ঞান হলে সিনেমার নেশা আমার ভালোই পেয়ে বসেছিল। সব ছবি নয়। বাছাই করা। তবে স্কুল পালিয়ে কখনো হলে ঢুকি নাই। বাসা থেকে অনুমতি নিয়ে আব্বা বা আম্মার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে ছবিহলে ঢুকতাম। সাধারণত রোববারে। স্কুলছুটির দিনে। প্রায়শই ম্যাটিনি শো, না হলে ফার্স্ট শো। ইভিনিং শো ছিল ফার্স্ট আার নাইট শো ছিল সেকেন্ড শো।সামনে ছিল থার্ড ক্লাস। মাঝখানে সেকেন্ড ক্লাস। বসার জন্য কাঠের বেঞ্চি। তার পিছনে ফার্স্ট ক্লাস। গদি মুড়ানো বেঞ্চ। তার পেছনে লেডিজ ক্লাস। মেয়েদের আলাদা ব্যবস্থা। সামনে পর্দা টাঙানো থাকতো। সিনেমা শুরুর সময় হলের ভেতরকার সব বাতি নিভে গেলে সামনের পর্দা সরিয়ে দেয়া হতো।

বাতি নেভারও কায়দা-কানুন আছে। হলের বৈদ্যুতিক কায়-কারবার চলতো জেনারেটর দিয়ে। চালু হলেই হলের ভিতরে বাইরে লাইট সব জ্বলে উঠতো। আর উচ্চগ্রামে অর্ধেক শহর মাতোয়ারা করে বেজে উঠতো গান। হলের ভেতরেও তখন আলো ঝলমল। ছবি শুরুর অল্প কিছু আগে হলের ভেতরকার সব লাইট নিভে মাঝখানে একটা বড়ো লাইট জ্বলতে থাকতো। বাইরের লাইটগুলো অবশ্য যথারীতি জ্বলছে। তবে গানের আওয়াজ বাইরে নেই। হলের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে।বড়ো লাইটও নিভে গেলে গানও যেতো থেমে। সরব হয়ে উঠতো সবারকার সামনের শাদা পর্দাটা।আমি টিকেট কাটতাম লেডিজের। কখনো গেটম্যানকে টিকেটের পয়সা দিয়ে হলে ঢুকে যেতাম। বালক ছিলাম বলে লেডিজ ক্লাসে আমাদের অবাধ যাতায়াত।একবার থার্ড ক্লাসে টিকেট কেটেছিলাম। স্কুলের অভ্যাসবশত বসেছিলাম একদম ফার্স্ট বেঞ্চে। ছবিটা ছিল বাঘ ভাল্লুক সাপখোপের। সে এক ভয়াবহ অবস্থা। হিংস্র প্রাণীগুলো যেন লাফিয়ে লাফিয়ে আমার ঘাড়েই পড়তে চাইছিল।

একবার বাই চাপলো, রাতদুপুরে ছবি দেখবো। দেখতেই হবে। মহাকান্নাকাটি। ছোটো ছেলে। আদরের শেষ নেই। শত বুঝিয়েও থামানো যাচ্ছে না। শেষে দাবী পূরণ। আব্বা মোটেও ছবি দেখেন না। তিনিই নিয়ে এলেন আমাকে। সেকেন্ড শো। আমি চোখ বড়ো বড়ো করে ছবি দেখছি। আর আব্বা চোখ বন্ধ করে দিব্বি নাক ডাকছেন। কখনো কখনো দেখি, সটান বসে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছেন পর্দার দিকে। পরে তিনিই রহস্য ভেঙ্গেছেন, গান বাজনা নাচ প্যাচপ্যাচে ডায়লগে তাঁর প্রবল ঘুম পায়। আর নায়ক যখন ভিলেন আর তার লোকজনদেরকে ধুমছে প্যাদানি দেয়, তখন তাঁর টান টান উত্তেজনা। সত্যের ও ন্যায়ের বিজয় দেখে তার ভালো লাগে।

বায়োস্কোপের যাদুই বাক্স নিয়েও ঘুরতো জোকারম্যান। কোথাও স্ট্যান্ডের উপর বাক্সটা রাখা হতো। তার তিনটে বোয়ামের মুখ সাইজ ফুটো। তাতে আবার কাঁচ লাগানো। একেক দফায় তিনজন করে নামমাত্র পয়সা দিয়ে ছবি দেখতে পারে। ছবির পর ছবি। জোকার বাক্সের উপর চাবির গোছা আছড়ে আছড়ে সুর তোলে সাথে সাথে সুরেলা কণ্ঠে দৃশ্যের বর্ণনা: এই যে এইবার তাজমহল আইলো, দেখতে দেখতে চইল্যা গ্যালো। এইবার আইলো মিশর দেশের পিরামিড।সবাক সিনেমা দেখে বায়োস্কোপে আমার মজা নেই। তবে সিনেমাঅলাদের কাছ থেকে সিনেমার হ্যান্ডবিলের ফটো পত্রিকায় সিনেমার বিজ্ঞাপন কেঁটে ভাতের আঠায় জোড়া লাগিয়ে নিজেরাই বায়োস্কোপ বানাতাম। বিস্কুটের বাক্স কেটে একদিকে চৌকোণা মুখ বের করে নিতাম। ওতে লাগাতাম চকমকি স্বচ্ছ কাগজ। হ্যানডবিল আর বিজ্ঞাপন কেটে যে রোলটা বানাতাম, তার দুই প্রান্তে দুটি পটকাঠির দন্ডে লাগিয়ে ঢুকিয়ে দিতাম বিস্কুটের বাক্সে। হয়ে গেল আমাদের চাইতেও পিচ্চিদের জন্য বিনা পয়সার বায়োস্কোপ।

সেসময় সিনেমা হলগুলোর সাথে লাগোয়া পানবিড়ির দোকানে চলতি সিনেমার গানের চটি বই পাওয়া যেতো। সিনেমার গান ঘোরে মুখে মুখে। হিট গান হলে তো কথাই নেই।সিনেমা হলের একপাশে টাঙ্গানো থাকতো বিলবোর্ড। চলতি ছবি এর বিশেষ বিশেষ দৃশ্যের স্টিল ছবি সেখানে সাটানো থাকতো এই ছবিগুলোর একটি আধটি হাতিয়ে নেয়ার ঝোঁক আমাদের মধ্যে কারো কারো ছিল। আরেকটু বড়ো হলে দেকতে পাই সিনেমার কাগজ চিত্রালী। বেরুতো অবজারভার বিল্ডিং থেকে। একচেটিয়া বাজার ছিল তার। মাওলানা আকরম খাঁর মৃত্যুর পর দৈনিক আজাদ থেকে বেরুতে শুরু করে চিত্রাকাশ। আরো পরে ইত্তেফাক ভবন থেকে পূর্বাণী। সিনেমা নায়ক-নায়িকাদের খবরাখবর গুজব আর চটকদার গল্প– এই ছিল পত্রিকাগুলোর খাদ্য। আর ছিল প্রমাণ সাইজ নায়িকা নায়ক রূপসী অভিনেত্রীদের আকর্ষণীয় রংবেরং এর ছবি। তরুণ যুবা কিশোর বয়েসীরা সেসব ছবি পত্রিকা থেকে কেটে নিয়ে এলবাম সাজাতো। ঘের বেড়ায় দেয়ালে আঠা দিয়ে পত্রিকা সেঁটে ঘরকে রঙময় করে তুলতো।

এ এলাকায় তখন সিনেমার পালাবদল চলছে। আগে এ দেশে ভারতীয় বাংলা ছবি বেশ চলতো। তার সাথে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে এখানকার সিনেমা। জামালপুরের কৃতি সন্তান আনোয়ার হোসেনও এ আয়োজনে প্রধান নায়ক, কখনো খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ এদেশে ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ করায়। শুরু হয় উর্দু সিনেমার রাজত্ব। এমনকি ঢাকাতেও নির্মিত হতে শুরু করে উর্দু সিনেমা।এই সময় বিস্ফোরণ ঘটায় আবহমান বাংলার চিরায়ত লোককাহিনী রূপবান। এ ছবি ঢাকাই ছবির চেহারাই পাল্টে দেয়। এ এলাকার সিনেমাকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করায়।রূপবান মুক্তির আগেই রূপবান-কন্যা সুজাতা জামালপুরে এসেছিলেন। জামালপুর হাই স্কুল মঞ্চে এক নাটকের মঞ্চায়নে। এ নাটকে আরো অভিনয় করেছিলেন আনোয়ার হোসেন, আমজাদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, রাণী সরকার, রহীমা খাতুন।

আমাদের বাল্যে এক ভোরে ঘুম থেকে উঠে শহরময় রটে যাওয়া এক খবর এসে পৌঁছালো, এক সিনেমা হলে রাতের শেষ প্রহরে ঝামেলা হয়েছে। হলের সামনে এখনো পড়ে আছে গুলিবিদ্ধ লাশ। শহর ভেঙ্গে পড়েছে ঘটনা দেখতে। কৌতুহলে গিয়ে দেখি, গোবেচারা ধরনের এক ব্যক্তি মাটির ধুলোয় পড়ে আছে। তার বুক-পীঠ এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে গিয়েছে গুলি। জায়গাটার ফুটো কালচে লাল।সেই আমার প্রথম গুলিবিদ্ধ লাশ দেখা। এর বেশ কিছু পরে আরো একটা আধুনিক সিনেমা হল গড়ে ওঠে। কথাকালি। সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে আধুনিক মার্কেট।জামালপুরের সিনেমাপাড়াতেও লাগে আধুনিকতার হাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *