আবুল ফজলের ৩৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী

মো: মাহফুজুল হক (তুষার) : বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজলের ৩৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ । ১৯৮৩ সালের আজকের এই দিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে । আবুল ফজল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং রাষ্ট্রপতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি মূলত একজন চিন্তাশীল ও সমাজমনস্ক প্রবন্ধকার। তার প্রবন্ধে সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর ও স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।

আবুল ফজল ১৯০৩সালের ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মৌলবি ফজলুর রহমান এবং মা গুলশান আরার একমাত্র পুত্রসন্তান। প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। প্রকৃতির প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে তাঁর শৈশবের দিনগুলি অতীবাহিত হয়েছে।

তার নিজের ভাষায়- আমার ছেলেবেলা বেশকিছুটা বেপরোয়া ভাবেই কেটেছে। বিশেষতঃ যতদিন গ্রামে ছিলাম জীবনটা ছিল রীতিমতো উদ্দাম।… একটু বড় হয়ে দূর দূর গ্রামেও চলে যেতাম যাত্রা কি করিব গান শুনতে… চাঁদনী রাতে ছেলেরা “বদর” দিয়ে উঠলে কিছুতেই ঘরে স্থির থাকতে পারতাম না।(দ্র. ফজল, ১৯৬৬ পৃ: ২৬) এখানে অল্প কিছুদিন পড়ার পর বাবার সাথে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন। পরবর্তীতে নন্দন কাননে এক হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। মাদরাসা সেশন শুরু হতে দেরি ছিল বলে সাময়িকভাবে তাঁকে ঐ স্কুলে ভর্তি করা হয়। পরে ১৯১৩/১৪ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২৩সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯২৫সালে ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়থেকে ১৯২৮সালে বি.এ. পাস করেন। এছাড়া ১৯৪০সালে কলকাতাবিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন ।

বাবা মৌলবি ফজলুর রহমান এবং পিতামহ মৌলবি হায়দর আলীর পদাংক অনুসরণ করে আবুল ফজল আলেম হোক এমনটিই চেয়েছিলেন বাবা মৌলবি ফজলুর রহমান। কিন্তু আবুল ফজলকে সাহিত্যই বেশি আকর্ষণ করেছিল। পরবর্তীতে শিক্ষক হওয়ার সংকল্প করেন আবুল ফজল। আর এ জন্য ১৯২৯সালে বি.টি. পড়ার জন্য ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হন।

বি. টি. পাস করার পর ১৯৩১সালেচট্টগ্রাম ফিরে আসেন। চট্টগ্রামআসার পর সেখানকার কলেজিয়েট স্কুলে দ্বিতীয় মৌলবি হিসেবে কিছুদিন চাকরি করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে দুই মাস চাকরি করেন। এরপর চট্টগ্রাম কাজেম আলী বেসরকারি হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন। ১৯৩৩সালে তিনি খুলনা জেলাস্কুলে দ্বিতীয় পণ্ডিতের পদে স্থায়ীভাবে যোগ দেন। ১৯৩৭সালে খুলনা ছেড়ে এসে তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলেসহকারী ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৪১সালে কৃষ্ণনগর কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৩সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম কলেজ। এই কলেজের কলেজ গভর্নিং বডির নির্বাচনে তিনি দাঁড়ান এবং জয়ী হন। ১৯৫৯সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে এবং বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো : জীবনপথের যাত্রী, রাঙ্গা প্রভাত(১৩৬৪), চৌচির(১৯৩৪), মাটির পৃথিবী(১৩৪৭), আয়েশা, আবুল ফজলের শ্রেষ্ঠ গল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন, সমাজ সাহিত্য রাষ্ট্র, শুভবুদ্ধি(১৯৭৪), সমকালীন চিন্তা, রেখাচিত্র,সফরনামা,দুর্দিনের দিনলিপি,প্রদীপ ও পতঙ্গ ।সাহিত্য চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১২সালে বাংলাদেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার” হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয় তাকে।এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার(১৯৬২), প্রেসিডেন্ট সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৩), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬০), নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৮০), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আব্দুল হাই সাহিত্য পদক (১৯৮২), রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার এবং সমকাল পুরস্কার লাভ করেছেন।আবুল ফজল চট্রগ্রামে ১৯৮৩সালের ৪ মে মৃত্যুবরণ করেন।

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =