পরীক্ষায় নকল : একজন ইউএনওর আক্ষেপ

কোনমতেই রোধ করা যাচ্ছে নকল । অনেকেই শংকিত ভবিষৎ প্রজম্ম নিয়ে ।   প্রসাশন কি চাইলেই পারে  নকলমুক্ত সুন্দর পরীক্ষা উপহার দিতে ? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের অভিজ্ঞতা আক্ষেপের সাথে প্রকাশ করেছেন  জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ইউএনও মোহাম্মদ মিজানুর রহমান  । জামালপুর বার্তার পাঠকদের জন্য  নিচে তা হুবহু তুলে ধরা হলো …

“গাধার বেকার খাটুনি
===============
চলমান এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজে যেমন নানাজনের চক্ষুশূল হচ্ছি তেমনি নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়ানোসহ দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরীক্ষা কে না চায়। কিন্তু কেন্দ্রের চারপাশ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলের সার্বিক চিত্র দেখে তা বুঝার উপায় নাই। কেন্দ্রের ভিতরে ও বাইরের অবস্থা ভয়াবহ রকমের।

১) কেন্দ্রের মূল গেইটে কমপক্ষে দুই-তিন’শ অভিভাবক দাঁড়িয়ে আছেন। যাদের তেমন কোন কাজ নেই। দাঁড়িয়ে থেকে জটলা পাকানোই তাদের কাজ।

২) কিছু এলাকার বখাটে ছেলের কাজই হলো কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরাফেরা করা এবং সময় সুযোগ বুঝে দেয়াল টপকিয়ে কেন্দ্রের ভিতর চলে আসা। তারা নব্য রোমিও। জুলিয়টের কাছে এসে নিজের চেহেরা মোবারক দেখানোই এদের প্রধান কাজ।কেন্দ্রের যত একতলা-দু’তলা বিল্ডিং আছে তাতে উঠে শিষ দেয়া, চিৎকার করাসহ অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা চলছে। দিলাম দৌড়ানি। তারা হাসে আর দৌড়ায়। মনে হচ্ছিলো তারা আমাদের দৌড়ানির অপেক্ষায় ছিলো। এটা গেলো একপাশ; অন্যপাশের অবস্থা ততক্ষনে আগের মতই। কতক্ষণ আর নিজেদের এনার্জি থাকে।

৩) আরেক দল হলো অভিভাবক এবং তাদের সংগে নিয়ে আসা বিশেষজ্ঞ। তারা নকল সাপ্লাই দেয়া তাদের কর্তব্য ধরে নিয়েছে। যেকোন উপায়ে ফুল মার্কস উত্তর লেখানোর দায়িত্ব তারা তাদের কাধে নিয়ে নিয়েছেন। কেন্দ্রের চারপাশের যত বাড়িঘর আছে সেখানে তাদের অবস্থান; অবস্থান বললে ভূল হবে তারা দখল নিয়েছেন। দিলাম হানা। সকলেই বই খাতা রেখে দৌড়। কয়েকজন মহিলা আমার সামনেই বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে রক্ষা। বাড়ির মালিকরাও কম যান না। বলেন এরা আমার আত্মীয়-স্বজন। বললাম আনেন পবিত্র কোরান শরীফ। সেটা আনতেই রাজি। বললাম থাক লাগবে না।

৪) কেন্দ্রের ভিতরে বেঞ্চের উপর নকল রেখে আরাম করে লিখতেছে একজন পরীক্ষার্থী। কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তার পিছনে দাঁড়ানো। আমি বে-রসিক সেখানে গিয়ে হাজির। আমাকে দেখে শিক্ষকের উচ্চস্বর শুনলাম। সাবধান!! নৈবত্তিক উত্তরপত্রের সেট কোড অনেকেই লিখে নাই। তারা পাশের জনের সাথে মিলিয়ে বৃত্ত পূরণ করেছে। শিক্ষক মশাই সেই খাতায় স্বাক্ষরও করেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম দেখেন নাই; লা জবাব। সেট কোড পরপর তিনজনের একই। এটারও জবাব নাই।
৫) শিক্ষকদের সামনেই সবাই দেখাদেখি করে লিখে। কক্ষগুলো হয়ে যায় একেকটা মাছের বাজার। আমরা গিয়ে হাজির হলে শান্ত হয়। তখনই শুনা যায় তাদের উচ্চকন্ঠ সাবধান!!! শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করি কক্ষে আপনার কাজ কি। উত্তরে তিনি বলেন খাতা আনা, স্বাক্ষর করা, পরিক্ষা শেষে খাতা নিয়ে যাওয়া। বললাম গার্ড দেয়া লাগবে না। উত্তর নেই। মোটিভেট করার জন্য বললাম খাতা আনা-নেয়া করা তো দাপ্তরিক কাজ। তা পিয়নকে দিয়েও করানো যায়। আর গার্ড দেয়া তো সন্মানের কাজ; শিক্ষকদের মূল কাজ।

৮ টি পরীক্ষা কেন্দ্রের সবকক্ষেই কি আমার একার পক্ষে উপস্থিত থাকা সম্ভব। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের কি কোন দায় নাই। একা একা দৌড়াদোড়ি করে নিজেকে গাধা মনে হয়। মনে হয় গাধার বেকার খাটুনি খাটছি। নকল করে পাশ করলে তাদের ভবিষ্যৎ ই খারাপ হবে এটা বুঝানোর মত ক্ষমতা আমার আর নেই। কেউ কি তাদের বুঝাবেন।”

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × one =