ধ্বংসের পথে মোঘল স্থাপত্য ঘাঘড়া খান বাড়ি মসজিদ

রফিক মজিদ : মোঘল সম্রাজ্যের আমলের প্রায় ৪ শত বছরের পুরনো শেরপুরের ঘঘড়া লস্কর ‘খান বাড়ী’ জামে মসজিদটি আজো ঠাই দাড়িয়ে আছে কালের সাক্ষ্যি হয়ে। মসিজদটি আজো অক্ষত অবস্থায় থাকলেও এবং জাতীয় যাদুঘর এর প্রত্নতত্ব বিভাগ এর দেখাশোনা করলেও সঠিক পরিচর্যার অভাবে তা ভংগুর দশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবসীর অভিযোগ রয়েছে।
মসজিদটি’র বাইরে থেকে বিশাল আকার দেখা গেলেও ভিতরে খুব বেশী বড় নয়। একটি মাত্র গুম্বুজের উপর মসজিদটি তৈরী করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর এবং দক্ষিন পাশে রয়েছে দুইটি জানালা। মসিজিদের ভিতর ইমাম বাদে তিনটি সারিতে বা কাতারে ১০ জন করে মোট ৩০ জন মুসল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারে। তবে মসজিদের বাইরের অংশে অর্থাৎ বারান্দায় আরো প্রায় অর্ধশত মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। মসজিদের আকার বা পরিধি যাই হোক না কেন মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করার সময় নিজেকে মনে হয় ৪ শত বছর পেছনে চলে গেছি। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। তা নিজে উপস্থিত হয়ে নামাজ না পড়লে বিশ্বাস করানো বা বোঝানো সম্ভব নয়।
স্থাপত্যকলার অনুপম নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘খান বাড়ী’র মসজিদ টি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি উপজেলার ঘাগড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত। তাই কালের আবর্তে এই মসজিদের নাম ঘাগড়া লস্কর খান বাড়ি মসজিদ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে।
শেরপুর জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। মসজিদের গায়ে বর্তমানে যেসব নির্দশন পাওয়া গেছে সে অনুসারে ধারনা করা হয়, মোঘল সম্রাট আমলে বক্সার বিদ্রোহীদের নেতা হিরোঙ্গি খাঁর বিদ্রোহের সময় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। তবে মতান্তরে ভিন্ন মতও রয়েছে। মসজিদটির দরজার ওপর খোদাইকৃত মূল্যবান কষ্টি পাথরের উপর খোদাই করে আরবি ভাষায় এর প্রতিষ্ঠাকাল উল্লেখ করা হয়েছে হিজরি ১০২৮ বা ইংরেজী ১৬০৮ সন। মসজিদটির গঠন পদ্ধতি ও স্থাপত্য কৌশল শিল্পসমৃদ্ধ ও সুদৃশ্য। এর ভিতরে রয়েছে দুটো সুদৃঢ় খিলান। এক গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়দিকেই সমান। এর অভ্যন্তর ভাগ ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ফুট প্রস্থবিশিষ্ট। মসজিদের মধ্যখানে বড় গম্বুজের চারপাশে ঘিরে ছোট-বড় দশটি মিনার। এর মধ্যে চারকোণায় রয়েছে চারটি। মসজিদে দরজা রয়েছে মাত্র একটি। ভেতরে মেহরাব ও দেয়াল অঙ্কিত রয়েছে বিভিন্ন কারুকাজের ফুলদানী ও ফুল। তৎকালীন খান বাড়ীর লোকজন এবং গ্রামের আরো অনেকেই ৫৮ শতক জায়গার উপর মসজিদটি ওয়াকফো করে দেয়। এর মধ্যে মসজিদটির মূল ভাবন ও বারান্দা বা বর্ধিত জায়গা রয়েছে ১৭ শকতের উপর এবং ৪১ শতকের উপর জমিতে রয়েছে কবরস্থান। মসজিদের বর্তমান ইমাম হাফেজ মো. রুহুল আমীন জুম্মাসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়াচ্ছেন।
প্রায় দুই যুগ আগে মসজিদের সর্বশেষ ২১ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিচালনা কমিটি হলেও ওই কমিটি’র সভাপতি গোলাম মোস্তফা খান অনেক আগেই মৃত্যু বরণ করেছে। তার স্থলে আর কাউকে আজও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বা নতুন কোন কমিটি করা হয়নি। বর্তমানে কামরুজ্জামান খান এবং কোষাধক্ষ্য মামুন খান পেশাগত কারণে দীর্ঘ দিন থেকে ঢাকায় অবস্থান করছে। মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় কাজ বা কোন সিদ্ধান্ত তাদের মতামতের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। তবে জরুরী কোন বিষয়ে কোন কাজ স্থানীয় অন্যান্য সদস্যরাই করে থাকেন বলে ওই কমিটির সদস্য ও খান বংশের সদস্য খোরশেদ আলম খান জানান। দুর-দরান্ত থেকে অনেকেই আসেন মসজিদটি দেখতে। কেউ কেই এখানে নামাজ পড়তেও আসেন। আবার কেউ কেউ মসজিদেও সামনের দান বাক্সে ঐতিহাসিক ও পুরনো স্থাপত্য কলায় নির্মিত এবং ধর্মীয় একান্ত বিশ্বাসের কারণে অর্থ দান করেন থাকে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় একাধিক গ্রামবাসী জানান, মাঝে মধ্যে ঢকা জাতীয় ঘর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন এসে মসিজিদের ধোয়া মোছা এবং সংস্কার কাজ করে গেলেও তা দায়সারা ভাবে করে যায়।
গত প্রায় ১৫ বছর আগে জাতীয় যাদুঘর এর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির দায়দায়িত্ব গ্রহন করেছে। কিন্তু একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ, একটি সতর্কবাণী লাগানো ও দায় সারাভাবে বছরে একবার রং করা ছাড়া আর কোন ভূমিকা পালন করেনি। মসজিদটির মেঝে ডেবে যাচ্ছে, দেয়ালে ফাটল ধরছে। দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা না নিলে কালের এ নীরব সাক্ষী হয়তো নীরবেই হারিয়ে যাবে বলে স্থানীয়রা আশংকা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *