করোনা কালের দিনলিপি

মোঃ সোহেল রানা

ভোরের সূর্যিমামার সাথে হাসি নিয়ে ঘুম থেকে উঠি প্রতিদিন কিন্তু এখন তাতে রয়েছে একটু ভিন্নতা। প্রতিদিন মৃত্যু সংবাদ নিয়ে ঘুমিয়ে যাই, আবার ঘুম ভেংগে শুনি একই খবর।

এটা বাড়িয়ে তুলছে মনের বিষন্নতা। জানি না কবে মুক্তি মিলবে, খবরের পাতায় দেখতে পাবো নতুন করে করোনায় মৃত্যু হয়নি বিশ্বে। আমার ছোট্ট জীবনে ইতিহাসের অনেক কাহিনী শুনেছি,পড়েছি। তার মধ্যে আমার কাছে এটাই সবচেয়ে নির্মম মৃত্যুর ইতিহাস, যেখানে এত দুঃসংবাদের মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিমুহূর্তে।

এ কেমন দু:সহ মৃত্যু চিনছে না বয়সের সীমা, মানছে না কে ভিক্ষুক, কে রাজপ্রসাদের মালিক। কিন্তু এ মৃত্যুটাতে রয়েছে ভিন্নতা। কেড়ে নিচ্ছে মনুষ্যত্ব-মানবিকতাকে, যেখানে বাবার মৃত্যুতে সন্তানের দেখা মেলেনা জানাযায, খাটিয়াবিহীন কাঁধে করে নিয়ে বাবা বহন করছে সন্তানের লাশ!

বিশ্বের মাঝে কোন কোন দেশে চারদিকে মৃত্যুর ছড়াছড়ি, দেওয়া হচ্ছে গণকবর, মিলছেনা শেষ গোসলটাও। খেলার মাঠে ঘাসগুলোতে পরছে না শিশু-কিশোরের হৈ-হুল্লোড়ে বল নিয়ে ছুটাছুটি, মাঠে গজিয়ে উঠছে নতুন ঘাস। খোলা মাঠ যেন ঘুমন্ত।

জমজমাট স্থান বা স্টেশনগুলো জনমানবহীন হয়ে পড়েছে। স্টেশনগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত চলে যেতো হাজারো যাত্রী প্রতি মূহুর্তে, থাকত বিভিন্ন বয়সের মানুষের কলরব, হকারের চেচাঁমেচি , ট্রেন চলার ঝকঝক শব্দ আর ট্রেনের হুইসেলে ছিল মুখরিত। কিন্তু এখন প্লাটফর্ম শান্ত, নেই শিশুদের বাঁশির শব্দ, যাত্রী চলাচলের ব্যস্ততা।

দেখা মিলে না গণপরিবহনে ছিনতাই, চেচাঁমেচি, ধরো ধরো, মোবাইল নেই, টাকা নেই। যেন এক নিয়মের মধ্যে এসেছে সবাই। ভেসে আসে না বিদ্যালয় থেকে শিশুদের চেচাঁমেচি, হৈহুল্লোড়, কলরব, গায় না লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ।

ছুটি শেষে নেই আগে বাড়ি যাওয়ার ছুটাছুটির দৃশ্যগুলো, জানা নেই কবে খুলবে বিদ্যালয়, আবার দৌড়াবে মাঠে দলবেঁধে শিশুরা। পরীক্ষার্থীরা মানসিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, পরীক্ষা নেই, প্রস্তুতি নেই। যেখানে প্রতিদিনের সময়গুলো কাটতো রুটিন মাফিক ক্লাস ,আগমী ক্লাসের পড়া শিখা, হোম ওয়ার্কসহ নিজের সকল কাজে। কিন্তু এখন পুরোটা পাল্টে গেছে।

দিন এনে যারা দিন খায়, যারা একদিন কাজ না করলে চুলায় আগুন জ্বলে না, পুরো পরিবারে এখন তাদের নেই কোন আয়ের উৎস। এ খেটেখাওয়া মানুষদের সংসারে নেমে এসেছে অন্ধকারের ছায়া। কবে মুক্তি পাবে? সরকার এ খেটে খাওয়া, বিভিন্ন পেশার অসহায় পরিবারের জন্য হয়তো ত্রাণ দিচ্ছে কিন্তু সে ত্রাণ কি সব অভুক্ত পরিবার পাচ্ছে?

জীবন চলার পথে প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হয় হাজারো প্রাকৃতিক মহামারী, দুর্যোগ। করোনাও তেমনি একটি দুর্যোগ। মানুষ সৃষ্টিকূলের সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা জ্ঞান দিয়েছেন, হয়তো পূর্বের মহামারী কলেরা, ডায়রিয়া ও যক্ষা ইত্যাদি মতো এ রোগেরও মোকাবিলা করবে। আমি ভাগ্যকে বিশ্বাস করি হোক সেটা সুখ কিংবা দুঃখ, ভাগ্য কখনো একই স্থানে স্থির থাকে না হয়তো পূর্বের মহামারী মতো করোনার উত্তাপও কমে যাবে, পরিস্থিতিও একদিন স্বাভাবিক হবে ইনশাআল্লাহ, হয়তো সেটা বেশিদিন দূরে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *