আশ্রয়কেন্দ্র–সংকটে বাঁধ ও সেতুতে মানুষ

প্রথম আলো : মুল লেখার লিংক:  জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ। পানি বাড়ায় মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় অনেকে রাস্তা, সেতু ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিচ্ছে। বন্যার কারণে জেলার ১৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

গতকাল সকাল থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এ চিত্র পাওয়া যায়। বন্যাদুর্গত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পর তারা কোনো আশ্রয়কেন্দ্র খুঁজে পায়নি। তাদের কাছে পৌঁছায়নি কোনো ত্রাণসামগ্রী।

এ বিষয়ে জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর বলেন, দুর্গত এলাকার প্রায় পরিবারেরই কয়েক দিনের জন্য খাবার ঘরে থাকে। তারপরও কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। দুর্গত এলাকায় এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি।

বন্যার পানিতে ইসলামপুর-গুঠাইল, ইসলামপুর-উলিয়া, বলিয়াদহ-সিংভাঙা, মেলান্দহ-মাহমুদপুর সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। চারটি উপজেলায় ১৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ইসলামপুর উপজেলার দেওয়ানপাড়া, সিংভাঙা, ডেবরাইপ্যাচ, দক্ষিণ চিনাডুলী, বলিয়াহদ, ঢেংগারঘর, দরজিপাড়া, খলিশাকুড়ি, নবকুড়া, নোয়ারপাড়াসহ বেশির ভাগ এলাকায় এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি।

গতকাল সকালে নৌকায় ইসলামপুরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ঘরে পানি, অনেকেই খাটের ওপর বসে রয়েছে। অনেকে আবার আসবাব নিয়ে আশ্রয়ের খুঁজে রয়েছে। অনেকের দরজায় ছোট ছোট তালা লাগানো। পুরো এলাকায় তীব্র খাবার-সংকট। মাঝে মাঝে পানি সাঁতরে বা কলাগাছের ভেলায় বাড়িঘর দেখতে আসে কিছু বন্যার্ত মানুষ।

গতকাল দুপুরে হাওয়া বেগম কলাগাছের ভেলায় বাড়িঘর দেখতে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বাপু গত চার দিন থেকে পানি উঠানে ছিল। গত রাত থেকে হু হু করে বানের পানিতে ঘর তলিয়ে যায়। রাতে পরিবারের সবাই চকির মধ্যে ছিল। সকালে ডেবরাইপ্যাচ ব্রিজের ওপর আশ্রয় নিয়েছি। রাত থেকে সবাই না খাওয়া। কোথাও আগুন জ্বালানোর উপায় নাই। ত্রাণসামগ্রী তো দূরের কথা, আমাগো দুঃখ দেখতে প্রশাসনের কোনো লোকজন এখনো আসেননি।’

বেলা তিনটার দিকে ডেবরাইপ্যাচ সেতুর ওপর বৃদ্ধ আজগর আলী বসে ছিলেন। এ সময় তিনি মুড়ি খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, বাকিতে মুড়ি কিনেছেন। সকালে রান্না হয়নি। বাড়িতেও কোনো খাবার নেই। পরিবারের লোকজনও না খাওয়া অবস্থায়। গত তিন দিনে কোনো লোকজন তাঁদের ত্রাণসামগ্রী দেয়নি। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও খাবারের তীব্র সংকট রয়েছে। তাঁরসহ অনেকেরই কথা, আশ্রয়কেন্দ্র থাকলে তাঁদের এই যুদ্ধ করতে হতো না।

জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর বলেন, গত রাত থেকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৯০ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকার সংশ্লিষ্ট ইউএনওদের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী প্রতিটি দুর্গত এলাকায় পৌঁছে যাবে। বন্যার্তদের জন্য ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *